
ইতালির আবরুজো অঞ্চলের প্রাচীন গ্রাম পাগলিয়ারা দেই মার্সিতে দীর্ঘ তিন দশক পর প্রথম কোনো শিশুর জন্ম হয়েছে। গত মার্চ মাসে জন্ম নেওয়া লারা বুসি ট্রাবুক্কো নামের এই শিশুটি গ্রামটির বাসিন্দাদের জন্য এক পরম বিস্ময় ও আনন্দের বার্তা নিয়ে এসেছে। এই জন্মের ফলে গ্রামটির মোট জনসংখ্যা এখন ২০-এ দাঁড়িয়েছে।
লারার আগমনের আগে এই জনপদে মানুষের চেয়ে বিড়ালের সংখ্যাই ছিল বেশি এবং দশকের পর দশক ধরে সেখানে কোনো শিশুর কান্নার শব্দ শোনা যায়নি। বর্তমানে ৯ মাস বয়সী লারা স্থানীয়ভাবে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে, তাকে একনজর দেখতে অনেক পর্যটক এখন এই নিভৃত গ্রামে ভিড় করছেন। লারার মা সিনজিয়া ট্রাবুক্কো জানিয়েছেন, যারা আগে এই গ্রামের নামও জানত না, তারাও এখন তার মেয়ের কথা শুনে এখানে ছুটে আসছেন।
লারার এই জন্ম যেমন গ্রামবাসীর মনে আশার সঞ্চার করেছে, তেমনি এটি ইতালির বর্তমান জাতীয় জনসংখ্যা সংকটের এক করুণ চিত্রও ফুটিয়ে তুলেছে। ইতালির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ‘ইস্ট্যাট’-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটিতে জন্মহার ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সেই বছর পুরো ইতালিতে মাত্র ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৯৪৪টি শিশুর জন্ম হয়েছে এবং প্রজনন হার কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১৮-এ, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। চাকরির অনিশ্চয়তা, তরুণ প্রজন্মের বিদেশ পাড়ি দেওয়া এবং কর্মজীবী মায়েদের জন্য অপর্যাপ্ত সামাজিক সহায়তার অভাবকে এই ভয়াবহ জন্মহার হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। আবরুজো অঞ্চলে এই পরিস্থিতি সবচেয়ে প্রকট, যেখানে গত এক বছরে জন্মহার ১০ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে।
পাগলিয়ারা দেই মার্সি গ্রামের বর্তমান অবস্থা পুরো ইতালির এক প্রতীকী রূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা হু হু করে বাড়লেও নতুন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে না। স্থানীয় মেয়র জিউসেপিনা পেরোজ্জি এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন যে, গ্রামটি চরম জনশূন্যতায় ভুগছে এবং প্রবীণদের মৃত্যুর পর সেই শূন্যস্থান পূরণ করার মতো কেউ নেই।
সিনজিয়া ট্রাবুক্কো রোমের কোলাহল ছেড়ে নিজের দাদার এই স্মৃতিবিজড়িত গ্রামে ফিরে এসে লারার জন্ম দিয়ে এক সাহসী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ইতালির জর্জিয়া মেলোনির সরকার জন্মহার বাড়াতে প্রতিটি নবজাতকের জন্য ১ হাজার ইউরোর ‘বেবি বোনাস’ সুবিধা চালু করলেও লারার মা মনে করেন, শুধু টাকা দিয়ে এই সংকট মেটানো সম্ভব নয়।
ইতালির চাইল্ডকেয়ার বা শিশু যত্ন কেন্দ্রগুলোর অপ্রতুলতা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া এই দম্পতির জন্য এখন বড় উদ্বেগের কারণ। পাগলিয়ারা দেই মার্সি গ্রামে বর্তমানে কোনো স্কুল নেই এবং পাশের এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও শিশু সংকটে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ ছাড়া লারার বাড়ি থেকে এক ঘণ্টা দূরত্বের সুলমোনা শহরের হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগটি পর্যাপ্ত শিশুর জন্ম না হওয়ায় বন্ধ হওয়ার উপক্রমে পৌঁছেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মতে, নিরাপদ মাতৃত্বের নিশ্চয়তা ও উন্নত সামাজিক সেবা প্রদান না করে কেবল আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে নারীদের সন্তান ধারণে উৎসাহিত করা কঠিন। লারার জন্মের আনন্দ ছাপিয়ে ইতালির এই জাতীয় অস্তিত্বের লড়াই এখন দেশটির নীতিনির্ধারকদের সামনে এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
প্রকাশক : আরিফ মাহমুদ, প্রধান সম্পাদক : কাজী আবু ইমরান, সম্পাদক : আবু রায়হান মিকাঈল
ফেসবুক পেইজঃ facebook.com/kalaroanewsofficial, ই-মেইল : [email protected]