
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া বহুল আলোচিত ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) সম্ভাব্য বিষয়বস্তু সামনে এসেছে। যদিও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এতে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ভূমিকা, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল, জব্দ করা সম্পদ ছাড় এবং ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেছে তেহরান।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া গোপন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বা আসন্ন চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে ব্লুমবার্গ নিউজ ও আল আরাবিয়া যে নথি প্রকাশ করেছে, সেটিকেই তারা ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক বলে দাবি করেছে।
প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নির্দিষ্ট কোনও চূড়ান্ত সমাধান নেই। তবে ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে অঙ্গীকার করেছে।
এছাড়া সমঝোতা স্মারক আগামী শুক্রবার সই হওয়ার পর শুরু হওয়া ৬০ দিনের আলোচনায় তেহরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ বা ধ্বংসসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
চুক্তির কাঠামোতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল, মধ্যপ্রাচ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনীর ভবিষ্যৎ প্রত্যাহার নিয়েও প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৪ দফার সমঝোতায় যেসব বিষয় রয়েছে, সেগুলো হলো—
১. যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই চুক্তিতে ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবিলম্বে ও স্থায়ী অবসান’ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এবং ‘বর্তমান যুদ্ধে তাদের মিত্ররা’ এখন থেকে একে অপরের বিরুদ্ধে কোনও ধরনের শত্রুতামূলক পদক্ষেপ নেবে না এবং বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি থেকেও বিরত থাকবে। চুক্তিতে সরাসরি ইসরায়েলের নাম উল্লেখ না থাকলেও ‘মিত্রদের’ কথা থাকায় লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধও এর আওতায় পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
২. চুক্তিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করার এবং পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
৩. সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে দুই দেশ একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আলোচনা করবে। উভয় পক্ষের সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যাবে।
৪. চুক্তি সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেবে। এছাড়া চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের আশপাশের এলাকা থেকে নিজেদের বাহিনী প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে ওয়াশিংটন।
৫. চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই ইরান অবিলম্বে এমন পদক্ষেপ নেবে, যাতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হয়। অর্থাৎ পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকে যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া হবে।
৬. যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা ইরানের পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি ‘সমন্বিত পরিকল্পনা’ তৈরি করবে। এ পরিকল্পনার অর্থায়ন হবে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে ৬০ দিনের মধ্যে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।
৭. চুক্তি অনুযায়ী, ইরানের ওপর আরোপিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) গভর্নর বোর্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা আরোপিত প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞাগুলোও রয়েছে। তবে এসব প্রত্যাহারের সময়সূচি চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারিত হবে।
৮. ইরান আবারও জানিয়েছে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ এবং ইরানের পারমাণবিক প্রয়োজনসহ অন্যান্য পারমাণবিক ইস্যু চূড়ান্ত চুক্তিতে নিষ্পত্তি করা হবে।
৯. চূড়ান্ত চুক্তি সই হওয়ার পর উভয় দেশ বর্তমান অবস্থা বজায় রাখতে সম্মত হবে। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা অপরিবর্তিত রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না বা এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি আর বাড়াবে না।
১০. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানি অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবা রপ্তানির জন্য বিশেষ ছাড় দেবে। এর মধ্যে ব্যাংকিং, বীমা, পরিবহনসহ অন্যান্য সেবাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
১১. চূড়ান্ত চুক্তির দিকে অগ্রগতির আলোকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জব্দ বা সীমাবদ্ধ সম্পদ ও অর্থ ছাড় করবে। এসব অর্থ ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত খাতে ব্যবহার করা যাবে এবং তেহরান সেগুলো ব্যবহারের পূর্ণ অধিকার পাবে।
১২. চুক্তির সফল বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যতে এর প্রতিশ্রুতি রক্ষা নিশ্চিত করতে একটি বাস্তবায়ন তদারকি কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ।
১৩. সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারার বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়ার পর বাকি ধারাগুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনায় যাবে দুই দেশ।
১৪. চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন করা হবে।
প্রকাশক : আরিফ মাহমুদ, প্রধান সম্পাদক : কাজী আবু ইমরান, সম্পাদক : আবু রায়হান মিকাঈল
ফেসবুক পেইজঃ facebook.com/kalaroanewsofficial, ই-মেইল : [email protected]