
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতি জোরদার করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিসমূহ সংশোধনের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারও চাচ্ছে আগামী এক বছরের মধ্যেই স্থানীয় সরকারের সকল নির্বাচন সম্পন্ন করতে। এলক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বাজেট সংকুলানের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
ইসি জানিয়েছে, চলতি বছরের অক্টোবর মাস থেকেই ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনি কার্যক্রম শুরু করবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। ইউপি নির্বাচন শেষে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো শেষ করতে আমাদের প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা লাগবে। এর মধ্যে ইউপি নির্বাচনের জন্যই প্রয়োজন হবে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ বাজেট সংকুলানের জন্য ইতিমধ্যে আমরা কাজ শুরু করেছি।
স্থানীয় সরকারের কোন নির্বাচন প্রথমে অনুষ্ঠিত হবে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের বাজেট এবং অন্যান্য প্রস্তুতি শেষে প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে চূড়ান্ত পরামর্শ দেব। নির্বাচন কমিশন তাদের প্রস্তুতির আলোকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।
এদিকে নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের কার্যক্রমও প্রায় শেষ করেছে বলে জানা গেছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে এ আইনের চূড়ান্ত খসড়া অংশীজনের মতামতের জন্য ইসির ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করেছে। সেটির উপর রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের কাছ থেকেও মতামত চাওয়া হয়। সংশোধিত বিধিমালায় অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ বন্ধ, পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ, প্রবাসীর জন্য পোস্টাল ব্যালট বাতিলসহ নির্বাচনি প্রচারে উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়রকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া বেশিসংখ্যক প্রার্থীর মনোনয়ন ঠেকাতে জামানতের পরিমাণ বাড়ানোসহ বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে বিধিমালায়।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে মতামত চাওয়া হয়েছিল। এছাড়া প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনে অংশীজনের মতামত নিতে চূড়ান্ত খসড়া নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে অনেকে মতামত দিয়েছেন। সেইগুলো সন্নিবেশিত করে আইন-বিধি সংশোধন করা হবে। এক্ষেত্রে শুরুতে ছোট নির্বাচন (ইউপি) দিয়ে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসি সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন পর স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এবারের নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাধারণত জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন ঘটায়। ফলে স্থানীয় নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক শক্তি এবং ভোটারদের প্রত্যাশা সব কিছুই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। অক্টোবরে ভোটের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা ভোটারতালিকা হালনাগাদ, ভোটকেন্দ্রের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি, নির্বাচনি সামগ্রী সংগ্রহ এবং মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়ে কাজ করছেন। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়েও প্রাথমিক পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকারেও আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না। ফলে আওয়ামী লীগ ছাড়াই জোর নির্বাচনি তত্পরতা শুরু হয়েছে। তৃণমূলের এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গ্রামাঞ্চলে ইতিমধ্যে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান, মেয়র ও সদস্য প্রার্থীদের তত্পরতা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় উন্নয়ন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। পোস্টার, ব্যানারে ছবি দিয়ে এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় নেতারাও সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে।
অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাওয়া সম্ভাব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন এক নির্বাচনি আবহ তৈরি হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে শুরু হওয়া এ প্রক্রিয়া আগামী মাসগুলোতে দেশের রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি ও প্রার্থিতা ঘোষণা :
বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতিমধ্যে এলাকায় এলাকায় গণসংযোগ করছেন। তাদের পোস্টার, ফেস্টুন ও ব্যানারে সয়লাব হাট-বাজার, গুরুত্বপূর্ণ সড়কের অলিগলি ও জনসমাগমস্থল। নিজেদের পরিচিতি তুলে ধরতে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন তারা। ভোটারদের মনোযোগ টানতে ব্যক্তিগত যোগাযোগের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও জোর দিচ্ছেন তারা।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা তৃণমূলের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড তুলে ধরছেন। জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমাদের দলীয় প্রস্তুতি রয়েছে। নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হওয়ার পর দলীয় পূর্ণ শক্তি নিয়ে সবাই (নেতাকর্মী) ভোটের মাঠে নামবে। সরকারের কার্যক্রমের সফলতায় জাতীয় নির্বাচনের সাফল্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পড়বে বলে মনে করেন বিএনপির এ সিনিয়র নেতা।
এদিকে ১২টি সিটি করপোরেশনে জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। ইতিমধ্যে ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটির সম্ভাব্য প্রার্থীর নামও ঘোষণা করা হয়েছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দলীয় প্রার্থীদের চূড়ান্ত করা হচ্ছে। প্রার্থী বাছাইয়ে অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিছু এলাকায় ১১-দলীয় ঐক্যের শরিকদের সঙ্গে সমঝোতা হতে পারে। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়র পদে ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গত ১০ মে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়।
এনসিপির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে আসা ও রাজনীতির বাইরে থাকা যোগ্য ব্যক্তিদের যাচাই-বাছাই করে এই প্রার্থী তালিকা তৈরি করা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে আরো ১০০ উপজেলার প্রার্থী ঘোষণা করতে যাচ্ছে এনসিপি।
সূত্র: ইত্তেফাক
প্রকাশক : আরিফ মাহমুদ, প্রধান সম্পাদক : কাজী আবু ইমরান, সম্পাদক : আবু রায়হান মিকাঈল
ফেসবুক পেইজঃ facebook.com/kalaroanewsofficial, ই-মেইল : [email protected]