
মিঠুন সরকার, কৃষি প্রতিবেদক:
প্রচলিত ফসল চাষের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের কৃষকরা এখন ঝুঁকছেন লাভজনক ও সম্ভাবনাময় খাতের দিকে। এর মধ্যে অন্যতম একটি সম্ভাবনাময় খাত হলো ঔষধি গাছের চাষ। তুলনামূলক কম খরচ, কম পরিশ্রমে অধিক লাভ এবং বাজারে এর ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে ঔষধি গাছ চাষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। প্রচলিত ধানের বা সবজির পাশাপাশি এই ভেষজ উদ্ভিদ চাষ গ্রামীণ অর্থনীতিতে যোগ করছে নতুন মাত্রা।
কম খরচে বেশি লাভ
ঐতিহ্যগতভাবে কৃষকরা ধান, পাট, গম বা শাকসবজি চাষে অভ্যস্ত হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সার- বীজের বাড়তি দাম এবং অনেক সময় উৎপাদিত পণ্যের উপযুক্ত মূল্য না পাওয়ায় কাক্সিক্ষত লাভ থেকে বঞ্চিত হন। ঠিক এই জায়গায় বিকল্প ও লাভজনক আয়ের উৎস হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে তুলসি, কালমেঘ, অশ্বগন্ধা, ঘৃতকুমারী (অ্যালোভেরা), সর্পগন্ধা, থানকুনি, নিম, অর্জুন এবং বহেড়ার মতো ঔষধি গাছগুলো।
কৃষিবিদদের মতে, ঔষধি গাছের চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার বা কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না বললেই চলে। অনেক গাছ একবার রোপণ করলে বছরের পর বছর ফলন পাওয়া যায়। রোগবালাই কম হওয়ায় এবং রক্ষণাবেক্ষণ সহজ হওয়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচ অনেক কমে যায়।
জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের ছোঁয়া
দেশের বিভিন্ন জেলায় এখন বাণিজ্যিকভাবে ঔষধি গাছের চাষ শুরু হয়েছে। অনেক বেকার যুবক ও প্রান্তিক কৃষক পতিত জমি বা বাড়ির আশপাশের খালি জায়গায় এসব গাছের চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
রংপুরের এমনই একজন কৃষক রহিম উদ্দিন। তিনি গত দুই বছর ধরে প্রায় দুই বিঘা জমিতে কালমেঘ ও ঘৃতকুমারী চাষ করছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে তিনি জানান, “আগে ধান চাষ করে লাভের মুখ দেখা কঠিন হতো। কিন্তু ঔষধি গাছ চাষ করে খরচ বাদে দ্বিগুণ লাভ থাকছে। এখন আর সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় না।”
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববাজারে চাহিদা
প্রাকৃতিক উপাদানের তৈরি আয়ুর্বেদিক, ইউনানি এবং ভেষজ প্রসাধন পণ্যের চাহিদা বিশ্বজুড়েই আকাশচুম্বী। দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন দেশীয় উৎস থেকেই কাঁচামাল সংগ্রহে বেশি জোর দিচ্ছে। ফলে কৃষকদের উৎপাদিত ঔষধি গাছ বিক্রির জন্য বড় কোনো বিপণন সংকটে পড়তে হয় না। স্থানীয় হাটবাজারের পাশাপাশি সরাসরি পাইকার বা ওষুধ কোম্পানির কাছে এসব ভেষজ উদ্ভিদ বিক্রি করে ভালো দাম পাচ্ছেন চাষিরা।
কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ঔষধি গাছের চাষকে আরও জনপ্রিয় করতে এবং কৃষকদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। পতিত জমি ও বাড়ির আঙিনাকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি আয় করা যায়, সে বিষয়ে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যদি ঔষধি গাছ চাষে সহজ শর্তে ঋণ, সংরক্ষণাগার এবং সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা করা যায়, তবে এই খাতটি দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারবে।
সবুজ পাতার এই ভেষজ উদ্ভিদগুলো কেবল কৃষকের পকেটেই বাড়তি সচ্ছলতা আনছে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল ও টেকসই করে তুলতে রাখছে অনন্য ভূমিকা।
প্রকাশক : আরিফ মাহমুদ, প্রধান সম্পাদক : কাজী আবু ইমরান, সম্পাদক : আবু রায়হান মিকাঈল
ফেসবুক পেইজঃ facebook.com/kalaroanewsofficial, ই-মেইল : [email protected]