
নাসিব হাসান রিয়ান। প্রতিভাবান টগবগে যুবক। অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক। রাজধানীর বিসিআইসি কলেজের একাদশ শ্রেণীর মেধাবী শিক্ষার্থী। মুহুর্তেই পুলিশের বুলেটের ঝাঁঝরা বুক-মুখ। একটি স্বপ্নের পরিসমাপ্তি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের বিজয়ের প্রাক্কালে রাজধানী ঢাকায় শহীদ হন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব গোলাম রাজ্জাকের পুত্র নাসিফ হাসান রিয়ান। তাদের পৈত্রিক নিবাস সাতক্ষীরা শহরে।
পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় বোঝা হলো- পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ। সেই বোঝার করুণ কাহিনী শুনে যে কেউ মর্মাহত হবে, চোখ ভিজে যাবে। সচিবালয়ের নিজের অফিসে সেই দিনপুঞ্জের ঘটনার কাহিনী শোনালেন এমনি এক হতভাগা অথচ গর্বিত পিতা গোলাম রাজ্জাক। ৩ ছেলের মধ্যে রিয়ান ছিলেন দ্বিতীয়।
জুলাই শহীদ রিয়ানের পিতা গোলাম রাজ্জাক জানান, উদীয়মান ক্রিকেটার হলেও পাইলট হওয়ার স্বপ্ন ছিলো নাসিব হাসান রিয়ানের। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর শ্যামলীর রিং রোডে আন্দোলন চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়।
তিঁনি আরো জানান, নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ও দেশীয় ক্রিকেট খেলায় অংশ নিয়ে ২৭ লাখ টাকা উপার্জন করেছিলেন রিয়ান। সেই টাকা দিয়ে শখের একটি গাড়িও কিনেছিলো রিয়ান। সেই গাড়িতেই তার গুলিবিদ্ধ দেহ নিয়ে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিলো। হাসপাতালেও ছিলো ভীতিকর অবস্থা।
গোলাম রাজ্জাক বলেন, দেখতে দেখতে দুটি বছর কেটে গেলো, তবু যেনো সে সবসময় আমাদের মাঝেই আছে, আছে আমাদের অস্তিত্বে। মৃত্যুর কয়েক মাস আগেও সুঠাম দেহ, ফর্সা আর মায়াবী চেহারার কারণে কাজী হায়াতের একটি চলচিত্রে রিয়ানের অভিনয়ের প্রস্তাবও ছিলো। তবে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া রিয়ানের স্বপ্ন ছিলো পাইলট হওয়া। টেলিভিশনে সে আগ্রহ নিয়ে উড্ডয়ন ও অবতরণের দৃশ্য দেখতো। পালন করতো পরিবারের বিভিন্ন দায়িত্বও। ছেলের মৃত্যুর পর পুরো পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। দুই বছর পরেও তাঁর পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়।
স্বজনদের ভাষ্য, জুলাইয়ের আন্দোলনের পুরো সময়ই রিয়ান ঘটনাপ্রবাহের খোঁজখবর রাখতো। বিশেষ করে ১৮ জুলাই তার বন্ধু ফারহান ফাইয়াজ নিহত হওয়ার খবর তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। পরিবারের সদস্যদের সে জানিয়েছিলো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা নিজের নৈতিক দায়িত্ব।
পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ৫ আগস্ট সরকার পতনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীর শ্যামলী, মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকায় মানুষের সমাগম শুরু হয়। তবে হায়েনাদের বিভৎসতা তখনো চলমান। পরিবারের নিষেধ উপেক্ষা করে রিয়ানও একটি বিজয় মিছিলে যোগ দিতে বাসা থেকে বের হন। রিং রোড এলাকায় সংঘর্ষে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। তার বুকে, মুখে ও কাঁধে গুলি লাগে। পরে উপস্থিত লোকজন তাকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর রিয়ান মারা যায়। সেদিন রাতেই শ্যামলী জামে মসজিদে নামাজে জানাজা শেষে কেরানীগঞ্জের আমবাগিচা কবরস্থানে তার নানার কবরের পাশে দাফন করা হয়।
রিয়ানের মায়ের বর্তমান অবস্থার কথা তুলে ধরে গোলাম রাজ্জাক বলেন, ছেলেকে হারানোর পর থেকে তার স্ত্রী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মায়ের নিয়মিত ওষুধ ও ইনজেকশন গ্রহণের বিষয়টি দেখাশোনা করতেন রিয়ান। ছেলের মৃত্যুর পর তিনি স্বাভাবিক জীবনে আর ফিরতে পারেননি।
রিয়ানের পিতা গোলাম রাজ্জাকের করা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৫৩ জনের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
পরিবারের কোনো আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন নেই; সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচার চান রিয়ানের বাবা। একই সাথে পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও দাবি জানান।
প্রকাশক : আরিফ মাহমুদ, প্রধান সম্পাদক : কাজী আবু ইমরান, সম্পাদক : আবু রায়হান মিকাঈল
ফেসবুক পেইজঃ facebook.com/kalaroanewsofficial, ই-মেইল : [email protected]