
দেশ পুনর্গঠনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের ব্যাপারে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, অনেক আন্দোলন, সংগ্রাম ও তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। এখন সময় দেশ পুনর্গঠনের, দেশকে এগিয়ে নেওয়ার। যারা ষড়যন্ত্র করতে চায়, তাদের ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে এবং জনগণকে সতর্ক করতে হবে।
জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপি আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
সভায় জুলাই আন্দোলনের শরিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
তারেক রহমান বলেন, সরকার জনগণের সামনে যে পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে এবং দেশ পুনর্গঠনের জন্য যা করতে চায়, সেগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হবে। জনগণ এখন চায় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন হোক। মানুষ রাস্তায় শান্তি, সন্তানের শিক্ষার সুযোগ, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং যোগ্যতা অনুযায়ী ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরির সুযোগ চায়।
তিনি বলেন, জনগণ একই সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক অধিকার সময়মতো প্রয়োগ করতে চায়। সাম্প্রতিক সময়ে পত্রপত্রিকায় যেসব ঘটনা প্রকাশিত হচ্ছে, সেগুলো কোনো গণতন্ত্রে বিশ্বাসী মানুষ চায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ সময় তিনি সবাইকে জনগণের চাওয়া পূরণে নিজেদের নিয়োজিত করার আহ্বান জানান।
জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার অঙ্গীকার
জুলাই আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্দোলনে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং বহু অরাজনৈতিক মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সরকারের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, যাদের চিকিৎসা প্রয়োজন, তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। যাদের কর্মসংস্থান প্রয়োজন, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।
একই সঙ্গে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
জিয়া ও খালেদা জিয়ার পথেই থাকতে চায় বিএনপি
তারেক রহমান বলেন, শহীদ জিয়াউর রহমান দেশের জন্য কাজ করেছেন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দেশে প্রায় ৮০ হাজার শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিএনপি সেই পথই অনুসরণ করতে চায় এবং এমন কাজ করতে চায়, যার সুফল জনগণ পাবে।
তিনি বলেন, জনগণ শুধু কথা শুনবে না, কাজের বাস্তব ফলও দেখতে চায়। বিএনপি এমন কাজ করতে চায়, যাতে মানুষ মনে করে তাদের পরিবার ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হয়েছে।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকেই অনেক কথা বলবেন, কিন্তু সব কথায় কান দেওয়ার প্রয়োজন নেই। দেশের মানুষের জন্য কাজ করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান জানান, তিনি নিজের বাড়িঘরসহ অনেক কিছু হারিয়েছেন। উপস্থিত অনেকেই বিভিন্ন নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্য দিয়ে গেছেন এবং জীবনে অনেক কিছু হারিয়েছেন।
তিনি বলেন, এখন মানসিকতা পরিবর্তনের সময় এসেছে। জনগণ যে দায়িত্ব দিয়েছে, তা সততার সঙ্গে পালন করাই সবার দায়িত্ব। কী পাওয়া যাবে, সেটি বড় কথা নয়; দেশ ও জনগণকে কী দেওয়া যাবে, সেটিই হোক জুলাইয়ের শপথ।
তরুণদের খেলাধুলা ও সৃজনশীলতায় যুক্ত করার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফুটবল প্রতিযোগিতায় ২২ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। পাশাপাশি ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের নতুনকুঁড়ি স্পোর্টস প্রতিযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, তরুণ সমাজ মাদকে জড়িয়ে পড়ছে— এটি একটি বড় সমস্যা। সবাইকে চিকিৎসা দেওয়া বা জেলে পাঠানো সম্ভব নয়। তাই তাদের শক্তিকে ইতিবাচক পথে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। খেলাধুলা, বিজ্ঞান মেলা কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা গেলে তরুণেরা খারাপ পথে না গিয়ে ভালো পথে এগিয়ে যাবে।
নিজের ছোটবেলার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার গিটার ও পিয়ানো শেখার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু শেখা হয়নি। অনেকেরই বিভিন্ন ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে যায়। তাই শিশু-কিশোরদের যে বিষয়ে আগ্রহ আছে, সেই সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।
এসময় বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের সহচরী ফাতেমার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারেক রহমান একটি ঘটনার কথা বলেন।
তিনি জানান, ফাতেমার ছেলে তার মাকে একটি ফুটবল ক্লাবে ভর্তি করে দিতে বলেছে। কারণ, সেখানে খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত থাকলে এমন কিছু বন্ধুদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে পারবে, যাদের সঙ্গে থাকলে ভালো থাকবে না।
এই প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যখন একটি শিশু নিজেই নিজের ভালো-মন্দ বোঝার চেষ্টা করছে, তখন দেশের সব শিশুর জন্য ভালো পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাদের চাওয়া বুঝে সেই পথ তৈরি করে দিতে হবে।
তিনি বলেন, এ কারণেই সরকার ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ধারণা অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম সাজাতে চায়। তার ভাষায়, এটিই জুলাইয়ের চেতনা কিংবা স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ছোটবেলা থেকে দেখেছি- শহীদ জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া দেশের মানুষের জন্য এভাবেই চিন্তা করতেন।
জুলাই আন্দোলন ছিল জনগণের আন্দোলন
তারেক রহমান বলেন, জুলাই আন্দোলন ছিল জনগণের আন্দোলন। জনগণ পরিবর্তন চেয়েছিল বলেই আন্দোলন সফল হয়েছে। আন্দোলনের কৃতিত্ব কোনো একক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের নয়; এটি দেশের সর্বস্তরের মানুষের।
তিনি বলেন, গত ১৭ বছর বিএনপিসহ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রাজপথে ছিল এবং জনগণকে কখনো একা ফেলে যায়নি। জনগণ সম্পূর্ণভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণেই জুলাই-আগস্টের আন্দোলন সফল হয়েছে। তিনি এ আন্দোলনের সঙ্গে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জনগণের অংশগ্রহণের তুলনাও টানেন।
৩১ দফা এখন জনগণের
বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সংস্কার প্রস্তাব এবং পরে শরিক দলগুলোকে নিয়ে ঘোষিত ৩১ দফার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক নির্বাচনে জনগণ বিএনপির পক্ষে যে ম্যান্ডেট দিয়েছে, তাতে রাষ্ট্র মেরামতের ওই প্রস্তাবগুলোর প্রতিও জনগণের সমর্থন স্পষ্ট হয়েছে।
তিনি বলেন, ৩১ দফা এখন আর শুধু বিএনপির নয়, এটি জনগণের ৩১ দফা। এর মূল লক্ষ্য জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বিভাজিত প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার একটি বিধ্বস্ত ব্যবস্থা পেয়েছে।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
দলের প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য দেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, গণসংহতি আন্দোলনের জুনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম এবং ভাসানী জনশক্তি পার্টির সভাপতি শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু।
এছাড়া বক্তব্য দেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আমিনুল হক, দক্ষিণ বিএনপির রফিকুল আলম মজনু, যুবদলের সভাপতি এম মোনায়েম মুন্না, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী, কৃষক দলের সভাপতি হাসান জাফির তুহিন এবং ছাত্রদলের সভাপতি রকিবুল ইসলাম রাকিব।
অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রকাশক : আরিফ মাহমুদ, প্রধান সম্পাদক : কাজী আবু ইমরান, সম্পাদক : আবু রায়হান মিকাঈল
ফেসবুক পেইজঃ facebook.com/kalaroanewsofficial, ই-মেইল : [email protected]