
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর ঘিরে কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা চলছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সফর অনেকটাই থমকে আছে। দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চললেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্য ঘিরে বিরোধ আবারও জটিলতা তৈরি করেছে।
ঢাকার ভাষ্য, সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ।
ভারত অবশ্য সফর নিয়ে এখনো প্রকাশ্যে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।
কেন আটকে গেল তারেকের ভারত সফর
তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগ চলছিল। ভারত চলতি আগস্টে একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।
আগস্টের ২১ থেকে ২৫ তারিখের মধ্যে সফর হতে পারে—এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। তবে কোনো তারিখই শেষ পর্যন্ত দুই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
এর মধ্যে ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার একটি সংবাদ সম্মেলন পরিস্থিতি বদলে দেয়। ঢাকার অভিযোগ, ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ভারত দাবি করেছে, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে দেশটির সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
তাতেও ঢাকার অবস্থান বদলায়নি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ জন্য শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণের অনুরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা।
ভারত কী বলছে
তারেক রহমানের সফর নিয়ে নয়াদিল্লি এখনো বিস্তারিত মন্তব্য করেনি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সফর নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এ মুহূর্তে তার বলার মতো কিছু নেই।
তবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরেছেন। তার মতে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ‘পারস্পরিক স্বার্থের পরীক্ষায়’ উত্তীর্ণ হতে হবে। অর্থাৎ সম্পর্ক এমন হতে হবে, যা দুই দেশের স্বার্থই বিবেচনায় নেয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও বলেছেন, তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে ঢাকার কোনো তাড়াহুড়া নেই। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এখনো বোঝার চেষ্টা করছে, নতুন সরকারের সঙ্গে ভারত কী ধরনের সম্পর্ক চায়।
শেখ হাসিনাই বড় বিরোধের জায়গা
বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় জটিলতা এখন শেখ হাসিনাকে ঘিরে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এরপর থেকেই তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়ে আসছে ঢাকা।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে শেখ হাসিনা অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অস্বীকার করেছেন।
ঢাকা এখন তার প্রত্যর্পণ চায়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা ভারতের কাছে শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক আসামিদের দ্রুত প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। তবে রাজনৈতিক অপরাধের ক্ষেত্রে চুক্তিতে কিছু ব্যতিক্রমের সুযোগ আছে।
দিল্লির জন্যও নতুন বাস্তবতা
শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই সম্পর্কের সমীকরণ বদলে গেছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার এখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ঢাকার রাজনৈতিক মহলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও বেশি সমতা ও পারস্পরিক স্বার্থের দাবি জোরালো হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাকিল আহমেদ মনে করেন, দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
তার মতে, বাংলাদেশের মানুষ ভারতের সঙ্গে এমন সম্পর্ক চায়, যেখানে আত্মমর্যাদা ও পারস্পরিক স্বার্থ গুরুত্ব পাবে।
সীমান্ত ও অভিবাসন নিয়েও বিরোধ
শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিরোধের বাইরেও দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম সীমান্ত।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার। সীমান্তে বেড়া নির্মাণের ভারতের উদ্যোগ নিয়ে ঢাকার অসন্তোষ রয়েছে।
ভারতের ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতার বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্যও দুই দেশের সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।
এ ছাড়া ভারত অনিবন্ধিত বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে যাদের চিহ্নিত করছে, তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি নিয়েও বিরোধ রয়েছে। ঢাকার অভিযোগ, কখনো কখনো কূটনৈতিক যাচাই ছাড়াই মানুষকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতাও দিল্লির উদ্বেগ
বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে আগের তুলনায় ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ভারতের দৃষ্টিতে এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে ভারতের সহযোগিতাপূর্ণ ভূমিকা ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের একটি বিশেষ অবস্থানও ছিল।
কিন্তু বর্তমান সরকার সেই সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজাতে চাইছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এর ভিত্তি হিসেবে সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক সুবিধার কথা বলছে ঢাকা।
সামনে কী হতে পারে
বিশ্লেষকেরা বলছেন, সফর স্থগিত বা বিলম্বিত হওয়া মানেই দুই দেশের সম্পর্ক ভেঙে পড়া নয়। বরং এখন দরকার নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশীয় অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদ্বাজের মতে, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনার কোনো বিকল্প নেই।
তার মতে, প্রতিবেশী হওয়ায় বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে না।
শুধু সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষত সারবে না। এর জন্য রাজনৈতিক যোগাযোগ ও বাস্তব স্বার্থভিত্তিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর শেষ পর্যন্ত কবে হবে, সেটি এখনো অনিশ্চিত। তবে এই সফরকে ঘিরে টানাপোড়েন স্পষ্ট করে দিয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত, আঞ্চলিক রাজনীতি ও পারস্পরিক আস্থার প্রশ্নে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন এক নতুন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
প্রকাশক : আরিফ মাহমুদ, প্রধান সম্পাদক : কাজী আবু ইমরান, সম্পাদক : আবু রায়হান মিকাঈল
ফেসবুক পেইজঃ facebook.com/kalaroanewsofficial, ই-মেইল : [email protected]