


দুর্নীতিকে প্রায়ই অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষ গ্রহণ কিংবা সরকারি অর্থ লুটপাটের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। বাস্তবে এর পরিধি আরও বিস্তৃত। যখন যোগ্যতার পরিবর্তে পরিচয় ও তদবির চাকরি পাওয়ার মাধ্যম হয়ে ওঠে, যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম মেধাকে পেছনে ঠেলে দেয়, যখন চিকিৎসাসেবা পেতে অর্থ বা প্রভাবের প্রয়োজন হয়, যখন ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় সততার চেয়ে অবৈধ সুবিধা বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে, তখন দুর্নীতি কেবল আর্থিক অপরাধ থাকে না; এটি সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। এর ফলে মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা কমে যায়। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দুর্বল হয়, আর অন্যায়কে মেনে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকে।
দুর্নীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি একসময় স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার চেষ্টা করে। কেউ ঘুষ দিয়ে কাজ করিয়ে নেন, কেউ ঘুষ নিয়ে কাজ সহজ করে দেন। কেউ ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে নিয়ম ভাঙেন, আবার কেউ প্রতিবাদ না করে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেন। এভাবে অনিয়মের একটি চক্র তৈরি হয়। একপর্যায়ে সৎ মানুষকে অসুবিধায় পড়তে হয়, আর অসৎ মানুষ নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। যে সমাজে সততা দুর্বলতা এবং অসততা সাফল্যের সিঁড়ি হিসেবে বিবেচিত হয়, সে সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
এখানেই প্রশ্ন আসে, দুর্নীতি করে কারা? দুর্নীতি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, শ্রেণি কিংবা পেশার একক সম্পত্তি নয়। তবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ এবং সরকারি সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বেশি থাকায় তাঁদের জবাবদিহির প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতা-কর্মী, জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়লে তার দায় এড়ানোর সুযোগ সরকারের নেই। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যেমন সরকারের, তেমনি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাখার দায়িত্বও সরকারের।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার, বিরোধী দলের কাজ সরকারের সমালোচনা করা, অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা এবং জনগণের পক্ষে জবাবদিহি দাবি করা। কিন্তু বিরোধী দলের পক্ষে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের প্রশাসনিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রম তদারক করা, সরকারি প্রকল্পের অর্থের ব্যবহার নিশ্চিত করা কিংবা অপরাধের তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব সরকারের অধীন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার। ফলে দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, বিরোধী দল কিংবা নাগরিক সমাজের কোনো দায়িত্ব নেই। বিরোধী দলকে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক চর্চার মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। শুধু প্রতিপক্ষের দুর্নীতির অভিযোগ তুলে নিজেদের সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের আয়-ব্যয়, নির্বাচনী অর্থায়ন এবং দলীয় কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান হতে হবে নীতিগত, দলীয় সুবিধা-অসুবিধার বিবেচনায় নয়।
দুর্নীতি দমনে স্বাধীন ও কার্যকর দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রয়োজনীয়তা এখানেই। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করতে না পারে, তাহলে তার পক্ষে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে ব্যক্তি, পদ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া যাবে না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কার্যক্রমও জবাবদিহির আওতায় থাকতে হবে। কারণ দুর্নীতি দমনের দায়িত্ব পাওয়া কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেই যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে জনগণের আস্থা ধরে রাখা কঠিন।
সরকারের সদিচ্ছা দুর্নীতি দমনের প্রথম শর্ত হলেও শুধু সদিচ্ছার ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ। সরকারি কেনাকাটা ও উন্নয়ন প্রকল্পে দরপত্রপ্রক্রিয়া উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। প্রকল্পের ব্যয়, অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্য জনগণের জন্য সহজলভ্য করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের বিবরণ নিয়মিত প্রকাশ এবং স্বার্থের সংঘাত প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগ জানানোর নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে দুর্নীতির তথ্য প্রকাশকারী ব্যক্তি হয়রানি বা প্রতিশোধের শিকার না হন।
একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করা জরুরি। দুর্নীতির মামলার তদন্ত ও বিচার যেন অযথা দীর্ঘায়িত না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। তবে দ্রুত বিচারের নামে যেন নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণের আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা আইনের শাসনের পরিপন্থী। দুর্নীতি দমনের নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি করা হলে প্রকৃত দুর্নীতিবাজেরা আড়ালে থেকে যাওয়ার সুযোগ পাবে। তাই প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া এবং আইনের সমান প্রয়োগ।
এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারি সেবা ডিজিটাল করা, আবেদন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা, অর্থ লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি সেবার নির্ধারিত সময় ও খরচ প্রকাশ করা গেলে সাধারণ মানুষের হয়রানি কমতে পারে। তবে প্রযুক্তি নিজে দুর্নীতির সমাধান নয়। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মধ্যেও অনিয়মের সুযোগ থাকলে তার সুফল পাওয়া যাবে না। তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত নিরীক্ষা ও কার্যকর তদারকি।
সবচেয়ে বড় কথা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজ—সবারই এখানে ভূমিকা রয়েছে। শিশুদের সততা শেখানো যেমন জরুরি, তেমনি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার চর্চা প্রয়োজন। গণমাধ্যমকে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দুর্নীতির ঘটনা তুলে ধরতে হবে। নাগরিকদেরও নিজের সুবিধার জন্য ঘুষ দেওয়া কিংবা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তবে নাগরিকের নৈতিক দায়িত্বের কথা বলে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা আড়াল করা যাবে না।
দুর্নীতি দমনের প্রশ্নে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো নিজের দলের অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস। বিরোধী দলের কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তুলনামূলক সহজ হতে পারে, কিন্তু নিজের দলের প্রভাবশালী কেউ দুর্নীতিতে জড়ালে তাঁর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়াই প্রকৃত সদিচ্ছার পরিচয়। সরকার যদি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা ফিরতে শুরু করবে। অন্যথায় দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
মনে রাখতে হবে, সরকার পরিবর্তন হলেই দুর্নীতির সংস্কৃতি পরিবর্তন হয় না। ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ ও অনিয়মের পুরোনো চর্চা থেকে গেলে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। আজ যারা ক্ষমতায় আছেন, তাঁদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যক্তিগত বা দলীয় সম্পত্তি নয়। জনগণের দেওয়া দায়িত্বের অর্থ জনগণের কাছে জবাবদিহি করা। আগামী দিনে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাবেন, তাঁদের জন্যও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
একজন রিকশাচালক কিংবা শ্রমজীবী মানুষ যখন দুর্নীতিকে দেশের প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন, তখন সেটিকে নিছক সাধারণ মানুষের অভিযোগ ভেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এর মধ্যে রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে মানুষের গভীর হতাশা এবং প্রত্যাশার প্রতিফলন রয়েছে। দুর্নীতি কমলে শুধু সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধ হবে না, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, যোগ্যতার মূল্যায়ন বাড়বে, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হবে এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা ফিরে আসবে।
অতএব, দুর্নীতি দমনের দায়িত্ব কার—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দায়িত্ব একে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সরকারের দায়িত্ব নেতৃত্ব দেওয়া, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব নিজেদের স্বচ্ছ রাখা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করা এবং নাগরিকদের দায়িত্ব অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা। দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়তে হলে প্রথমে ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয় তখনই, যখন ক্ষমতার কাছের মানুষও আইনের বাইরে থাকার সুযোগ পান না। যে রাষ্ট্রে ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিকের জন্য আইন সমান, সেই রাষ্ট্রেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রকৃত পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
লেখক: সম্পাদক, সাহিত্যপাতা।

প্রকাশক : আরিফ মাহমুদ, প্রধান সম্পাদক : কাজী আবু ইমরান, সম্পাদক : আবু রায়হান মিকাঈল
ফেসবুক পেইজঃ facebook.com/kalaroanewsofficial, ই-মেইল : [email protected]