
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নিহতের সংখ্যা দেড়শ ছাড়িয়েছে। স্থানীয় সময় বুধবার (২৬ আগস্ট) ভুটেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যায় অন্তত ১৫৭ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৪০০ জন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি পর্যটক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছেন। দেশটির তিনটি জেলায় এ বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুওয়া জেলার রাসুওয়াগাধি এলাকায় বুধবার বেলা বাড়ার আগেই আকস্মিক এ বন্যা আঘাত হানে।
স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, ভুটেকোশি নদীর উপনদী লহেন্দে নদীর প্রবাহ একটি তুষারধসের কারণে আটকে যাওয়ার পর হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ পানি নেমে আসে। প্রথমে তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন তিমুরে এলাকায় আঘাত হানে বন্যার পানি। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই জনবসতিপূর্ণ ওই এলাকার বড় একটি অংশ পানিতে ভেসে যায়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওই এলাকায় বৃষ্টিপাতের কোনো খবর ছিল না। ফলে আকস্মিক এ দুর্যোগের বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের কোনো আগাম সতর্কতাও ছিল না। প্রতিদিনের মতো স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যস্ত থাকার মধ্যেই তাদের ওপর নেমে আসে বিপর্যয়।
রাসুওয়ার প্রধান কাস্টমস কর্মকর্তা রাজেন্দ্র ধুঙ্গানা জানান, বুধবার সকালে হঠাৎ মাটি কাঁপতে দেখে প্রথমে তিনি ভূমিকম্প হয়েছে বলে মনে করেছিলেন। বাইরে বের হয়ে তিনি উজান থেকে ধেয়ে আসা পানির বিশাল ঢেউ দেখতে পান। পানির সঙ্গে ধোঁয়ার মতো কিছু একটা দেখা যাচ্ছিল। মুহূর্তের মধ্যেই তিমুরে বাজার এলাকা পানির তোড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
বন্যার ভয়াবহতা বুঝতে পেরে ধুঙ্গানাসহ কয়েক ডজন মানুষ পাশের জঙ্গলে আশ্রয় নেন। রাসুওয়াগাধি কাস্টমস চেকপোস্টে অপেক্ষমাণ ৩০০টির বেশি গাড়ি ও ট্রাকও পানির স্রোতে ভেসে যায়।
এরপর বন্যার পানি সিয়াপ্রুবেশি হয়ে ভাটির দিকে ছড়িয়ে পড়ে। নদীপথে থাকা মানুষ, গবাদিপশু, ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতুসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা পানির স্রোতে তলিয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে ৩৯১ জন বিদেশি নাগরিক এবং ৪৪ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন।
নেপালের পুলিশের পক্ষ থেকে স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত পাওয়া অনুযায়ী, বন্যা ও ভূমিধসকবলিত এলাকাগুলো থেকে ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রাসুওয়ায় একজন, নুয়াকোটে ১১ জন, ধাদিংয়ে ১৮ জন, চিতওয়ানে ৩৩ জন, গোর্খায় ১৯ জন, তানাহু সাতজন এবং নওয়ালপুরে ১১ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে।
নেপাল পর্যটন বোর্ডের তথ্যমতে, নিখোঁজ ৪০৩ জনের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি নাগরিক। তাদের মধ্যে ভারতের ১৩৩ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ জন এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন রয়েছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ২০০ জন নারী ও ২০৩ জন পুরুষ। ধারণা করা হচ্ছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ২৬টি দেশের নাগরিক রয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন ৬১ জন নেপালিও।
বন্যায় নয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের নয়টি শাখা ধ্বংস হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে ১৯টি যান চলাচলযোগ্য সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার মহাসড়ক পানির তোড়ে ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি-বেসরকারি সম্পদের পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি।
নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা এবং ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা বিবেচনায় কর্মকর্তারা বলছেন, নেপালের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগগুলোর একটি হতে পারে এবারের বন্যা। এমনকি ১৯৯৩ সালে সারলাহী, রাউতাহাট ও মাকওয়ানপুরে ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যুর পর এটিই দেশটির সবচেয়ে প্রাণঘাতী দুর্যোগ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নুওয়াকোটের বিদুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নেপাল বলেন, সোল থেকে আক্কারে বাজার পর্যন্ত কয়েক’শ বাড়ি বন্যায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অনেকে নিরাপদ স্থানে যেতে পারলেও বহু প্রবীণ ও শিশু এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘ভোর থেকে আমি পৌর ভবনে আটকে আছি। বাড়ি ফেরার কোনো রাস্তা বা সেতু আর অবশিষ্ট নেই।’
একই নদীতে গত বছরও বন্যা হয়েছিল। তখন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে না ফিরতেই এবার আরও ভয়াবহ বন্যার মুখে পড়ল। গত বছরের ৮ জুলাই লহেন্দে নদীর বন্যায় অন্তত ১১ জন নিহত হন। ওই বন্যায় কয়েকটি স্থানে সড়কের অংশ ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি নেপাল ও চীনকে সংযোগকারী মিতেরি সেতুও ধ্বংস হয়েছিল।
এবারের ভয়াবহ প্রাণহানির পেছনে আগাম তথ্য ও সতর্কবার্তার ঘাটতিকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। রাসুওয়া জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিব্বত থেকে বন্যার সূত্রপাত হলেও এ বিষয়ে তারা আগে কোনো তথ্য পাননি।
প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাসুওয়াগাধি সীমান্ত চৌকি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে তিব্বতের একটি এলাকায় তুষারধসের পর লহেন্দে নদীতে ধ্বংসাবশেষসহ প্রবল স্রোতের সৃষ্টি হয়। ২৫ ও ২৬ আগস্টের স্যাটেলাইট ছবিতে তুষারধস এবং এর পরবর্তী বন্যার চিত্র দেখা গেছে।
বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর বুধবার বিকেলে নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ এবং চীনের আবহাওয়া প্রশাসনের কর্মকর্তারা ভার্চুয়াল বৈঠক করেন। পরে চীন নেপালকে আশ্বস্ত করেছে, সীমান্তের ওপারে নদীর পানির প্রবাহ বাড়তে শুরু করলে তারা দ্রুত নেপালকে তথ্য জানাবে।
সূত্র: দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট
প্রকাশক : আরিফ মাহমুদ, প্রধান সম্পাদক : কাজী আবু ইমরান, সম্পাদক : আবু রায়হান মিকাঈল
ফেসবুক পেইজঃ facebook.com/kalaroanewsofficial, ই-মেইল : [email protected]