
পাহাড়ের বুকজুড়ে মেঘের আনাগোনা, সবুজ পাহাড়ের সারি আর দিগন্তবিস্তৃত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য—এসব দেখতে প্রতিদিনই পর্যটকদের পদচারণে মুখর থাকার কথা রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক উপত্যকা। কিন্তু এখন সেখানে নেই চেনা কোলাহল। রিসোর্ট-কটেজে পর্যটকদের ভিড় নেই। পর্যটকবাহী চাঁদের গাড়ির সারিও চোখে পড়ছে না। সাজেকের পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। দফায় দফায় সড়ক অবরোধ, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও প্রশাসনের পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার কারণে থমকে গেছে পুরো পর্যটন কার্যক্রম। গত ১১ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া অবরোধ কর্মসূচি, মাঝখানে দুর্গাপূজা উপলক্ষে কয়েক দিনের শিথিলতা এবং বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) থেকে পুনরায় অবরোধের ঘটনায় সাজেকের পরিস্থিতি নতুন করে সংকটের মুখে পড়েছে। বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় সাজেক থেকে প্রায় তিন হাজার পর্যটককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই দিন উজোবাজার এলাকায় অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ এবং পরে গোলাগুলির খবর পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেকে পর্যটক ভ্রমণ বন্ধ রেখেছে। ফলে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) পর্যটকশূন্য সাজেকে স্বাভাবিক পর্যটন কার্যক্রম চালু হওয়ার কোনো পরিবেশ দেখা যাচ্ছে না।
আবার অচলাবস্থা
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন গত ১১ অক্টোবর থেকে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি শুরু করে। সংগঠন দুটির অভিযোগ, সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা এবং হয়রানির কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে একটি আঞ্চলিক সংগঠনের সশস্ত্র সদস্যদের এলাকা থেকে সরানো, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাড়িঘরে তল্লাশির ক্ষেত্রে হয়রানি বন্ধ করা।
অবরোধের কারণে সাজেক ও খাগড়াছড়ির দীঘিনালার মধ্যে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েন। পরিস্থিতির কারণে জেলা প্রশাসন গত ১১ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে সাজেকে পর্যটক ভ্রমণ বন্ধের নির্দেশ দেয়। পরে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর অবরোধ সাময়িকভাবে শিথিল হলেও সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। পরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে গত ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ কর্মসূচি শিথিল থাকায় সাজেকে পর্যটকদের যাতায়াত আবার শুরু হয়েছিল। এতে পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। ২১ অক্টোবর সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসন পুনরায় পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেয়। পরদিন ২২ অক্টোবর সকাল থেকে অবরোধ কার্যকর হলে সাজেক থেকে পর্যটকদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ বাধার মুখে পড়ে।
উজোবাজারে সংঘাত
বৃহস্পতিবার সকালে সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির দিকে ফিরছিলেন প্রায় তিন হাজার পর্যটক। পথে উজোবাজার এলাকায় অবরোধের কারণে যানবাহনের বহর আটকে যায়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগে পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়।রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আব্দুর রকিবের বক্তব্য অনুযায়ী, অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের পর সেখানে গোলাগুলি হয়। এ ঘটনায় কয়েকজন সেনাসদস্য ও পুলিশ সদস্য আহত হন। তবে পর্যটকদের কেউ আহত হননি বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অন্যদিকে, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) গোলাগুলির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, অবরোধকারীদের কর্মসূচি দমনে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালিয়েছে। এই সংঘাত পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে সাজেকের পর্যটননির্ভর অর্থনীতি, স্থানীয় মানুষের চলাচল এবং পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার ওপর সংকটের প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়েছে।
সাজেকের রুইলুই রিসোর্টের পরিচালক মিশু দে বলেন, ‘আমাদের রিসোর্টে ২২টি কক্ষ রয়েছে, যা পূজার বন্ধে শতভাগ বুকিং ছিল। অবরোধের কারণে ২২ তারিখ থেকে সব বুকিং বাতিল করেছেন পর্যটকরা। আমরা সবার বুকিংমানি ফেরত দিয়েছি। আবার কবে নাগাদ অবরোধ প্রত্যাহার হবে সেই অপেক্ষায় আছি।’
তিনি বলেন, পরিস্থিতি এমন হলে পর্যটন ব্যবসায় ধস নামবে এখানে। আমরা যারা বিনিয়োগ করছি আমাদের ক্ষতিপূরণ কে দেবে, এমন প্রশ্ন করেন এই পর্যটন ব্যবসায়ী।
পর্যটন ব্যবসায় বড় ধাক্কা
সাজেকের অর্থনীতির বড় একটি অংশ আবর্তিত হয় পর্যটনকে ঘিরে। শতাধিক রিসোর্ট-কটেজ, পর্যটক পরিবহনে ব্যবহৃত চাঁদের গাড়ি, রেস্তোরাঁ, দোকানপাট ও বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের আয়ের প্রধান উৎস পর্যটক। পর্যটকের উপস্থিতি কমে গেলে এসব প্রতিষ্ঠানের আয়ও দ্রুত কমে যায়।অবরোধ ও পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার কারণে রিসোর্ট-কটেজের আগাম বুকিং বাতিল বা স্থগিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পর্যটক পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত চালক ও মালিকরা গাড়ি চালাতে না পারায় আয় হারাচ্ছেন। রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং পর্যটকদের বিভিন্ন সেবা দেওয়া কর্মীদেরও কাজ কমে গেছে।
সাজেক পরিবহন কাউন্টারের ব্যবস্থাপক মো. আরিফ বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০-১৫০ পর্যটকবাহী জিপগাড়ি সাজেকে পর্যটক পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সাজেক সড়কে তৃতীয়বারের মতো অবরোধের কারণে আজ সাজেকগামী কোনো পরিবহন ছেড়ে যায়নি। এই রুটের পরিবহন সেবার সঙ্গে জড়িত শতশত শ্রমিক বেকার বসে আছেন।’
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুর্গাপূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে ১০ দিনের বন্ধে সাজেকের পর্যটন ব্যবসায় প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছিল। এটি ছিল সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাব। প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য প্রয়োজন। পরবর্তী সময়ে অবরোধ আবার শুরু হওয়ায় ব্যবসায়ীদের অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।ব্যবসায়ীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ রিসোর্ট পরিচালনায় কর্মীদের বেতন, বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ, খাবার ও অন্যান্য খরচ বহন করতে হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান আগাম বুকিং ও পর্যটন মৌসুমের আয়ের ওপর নির্ভর করে বিনিয়োগ ও ব্যয় পরিকল্পনা করে। দীর্ঘসময় পর্যটক না এলে নিয়মিত খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়বে।
সংকটে স্থানীয় মানুষের জীবন
সাজেকের সড়ক অবরোধের প্রভাব শুধু পর্যটন খাতে সীমাবদ্ধ নয়। সাজেক ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের বাজারে যাতায়াত, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন, চিকিৎসাসেবা গ্রহণ এবং কৃষিপণ্য বিক্রির জন্যও সড়ক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ।অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নেওয়া কঠিন হয়। পরিবহন সংকটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটতে পারে। দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল চালক, শ্রমিক, দোকানি ও সেবাকর্মীদের জীবিকাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে কাজ করে আয় করা স্থানীয় তরুণ ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য এ পরিস্থিতি বড় ধাক্কা। পর্যটক না থাকায় যেমন রিসোর্টে কাজ কমে যায়, তেমনি গাড়ি চালানো, মালপত্র বহন, খাবার সরবরাহ ও ছোটখাটো ব্যবসার সুযোগও সংকুচিত হয়। অবরোধ ও পর্যটন বন্ধের ঘোষণায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা।
সাজেক রিসোর্ট কটেজ মালিক সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা বলেন, ‘অবরোধের কারণে পর্যটকদের সাজেক ছাড়তে হয়েছে। অনেকে রিসোর্টের আগাম বুকিং বাতিল করেছেন। সাজেকে সড়ক অবরোধ হলে শুধু পর্যটক বা ব্যবসায়ীরা নন, স্থানীয় বাসিন্দারাও চরম ভোগান্তিতে পড়েন। খাদ্যসামগ্রী কেনাকাটা ও উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে এই সড়কে কোনো যানবাহন চলাচল করছে না। এতে স্থানীয়দের যাতায়াতও বন্ধ হয়ে গেছে।’
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উজোবাজারসহ আশপাশের এলাকার পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সাজেকে ভ্রমণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। নিষেধাজ্ঞার কারণে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা সাজেকে যেতে পারছেন না। আগে থেকে সেখানে অবস্থান করা পর্যটকরাও ফিরে যাওয়ায় রিসোর্ট ও কটেজগুলো ফাঁকা হয়ে পড়েছে।
রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আব্দুর রকিব বলেন, সাজেকের উজোবাজার এলাকায় সংঘর্ষের পর বর্তমানে পুরো এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সূত্র: জাগোনিউজ
প্রকাশক : আরিফ মাহমুদ, প্রধান সম্পাদক : কাজী আবু ইমরান, সম্পাদক : আবু রায়হান মিকাঈল
ফেসবুক পেইজঃ facebook.com/kalaroanewsofficial, ই-মেইল : [email protected]