
দেশে ও বিদেশে নানামুখী ভোগান্তিতে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য চলতি মাসেই চালু হচ্ছে ডিজিটাল ‘প্রবাসী কার্ড’। সরকারের এই উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংকিং সুবিধা, বীমা, বিনিয়োগ, সম্পদ সুরক্ষা, অনলাইন পেমেন্টসহ বিভিন্ন জরুরি সেবা একই প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। তবে উদ্যোগটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও তথ্যের নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রবাসী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং রিজার্ভ সমৃদ্ধ রাখতে প্রবাসীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিমানবন্দর, বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসসহ বিভিন্ন জায়গায় সেবা নিতে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। এর পাশাপাশি দালাল চক্রের প্রতারণা, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, অর্থ পাঠানোর জটিলতা এবং দেশে ফিরে পুনর্বাসনসংক্রান্ত নানা সমস্যারও মুখোমুখি হন তারা।
এসব ভোগান্তি কমাতেই সরকার ডিজিটাল ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে বিমানবন্দরে হয়রানি কমানোর পাশাপাশি দূতাবাসে অগ্রাধিকারভিত্তিক সেবা নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি ও প্রয়োজনীয় সেবার ফি এবং অন্যান্য অর্থ পরিশোধ অনলাইনেই সহজে করা যাবে।
এক সাক্ষাৎকারে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানান, ব্যাংকের পেমেন্ট গেটওয়ের সঙ্গে যুক্ত করে এই প্রবাসী কার্ড চালু করা হবে। সরকারের আশা, চলতি মাসের মধ্যেই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, কার্ডধারীরা বিমানবন্দরে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়ার পাশাপাশি বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসেও অগ্রাধিকার সুবিধা পাবেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সেবার ফি ও অন্যান্য পেমেন্টও এই কার্ডের মাধ্যমেই অনলাইনে সম্পন্ন করা যাবে।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, নতুন এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা তাদের উপার্জিত অর্থ আরও নিরাপদে সংরক্ষণ করতে পারবেন। কার্ডের সঙ্গে একজন পরিবারের সদস্যকে সম্পূরক (সাপ্লিমেন্টারি) কার্ডধারী হিসেবে যুক্ত করার সুযোগ থাকবে। সেই সদস্য মাসে সর্বোচ্চ কত টাকা উত্তোলন করতে পারবেন, সেটিও আগে থেকেই নির্ধারণ করে দেওয়া যাবে। এর ফলে প্রতারণা ও হুন্ডির ব্যবহার কমবে এবং অর্থ লেনদেনের স্বচ্ছ হিসাব সংরক্ষণ করা সহজ হবে।
তিনি বলেন, অনেক প্রবাসী আত্মীয়-স্বজনের কাছে টাকা পাঠান কিংবা সম্পত্তি কেনার উদ্দেশ্যে দেশে অর্থ পাঠান। কিন্তু দেশে ফিরে অনেকেই সেই অর্থ বা সম্পত্তি নিয়ে জটিলতায় পড়েন। প্রবাসী কার্ড চালু হলে তারা নিজেদের নামে থাকা অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা রাখতে পারবেন এবং সেই অর্থের ওপর সুদও পাবেন। প্রয়োজন হলে নির্ধারিত সীমার মধ্যে পরিবারের একজন সদস্য ওই অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা উত্তোলনের সুযোগ পাবেন।
প্রবাসীদের প্রত্যাশা, এই কার্ড চালু হলে দেশে ও বিদেশে তাদের ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। তাদের মতে, একই কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে যেমন অর্থ উত্তোলন করা যাবে, তেমনি বাংলাদেশেও সহজে আর্থিক লেনদেন করা সম্ভব হবে। তাই সরকার দ্রুত এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন প্রবাসীরাই।
অন্যদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মনে করছে, ডিজিটাল প্রবাসী কার্ডের মাধ্যমে তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পুরো কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকতে হবে, যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি না হয়।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পুরো ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজের আওতায় আনা গেলে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীরাই সেবা পাবেন। তবে রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা অসাধু কোনো গোষ্ঠী যাতে এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়েও সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ডিজিটাল প্রবাসী কার্ড চালু করলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। দেশে ও বিদেশে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে এই কার্ডের কার্যকারিতা, গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে সমন্বিত এবং কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের নানা ভোগান্তি কমানো এবং সেবাপ্রাপ্তি সহজ করা সম্ভব হবে।
প্রকাশক : আরিফ মাহমুদ, প্রধান সম্পাদক : কাজী আবু ইমরান, সম্পাদক : আবু রায়হান মিকাঈল
ফেসবুক পেইজঃ facebook.com/kalaroanewsofficial, ই-মেইল : [email protected]