
ইলিশ বাংলাদেশের পরিচিত ও জনপ্রিয় মাছ। অথচ সেই ইলিশই এবার ভারত থেকে আমদানি হয়ে আসছিল বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে। কয়েক সপ্তাহ ধরে আমদানির পরিমাণ বাড়লেও হঠাৎ করেই সেই পথ বন্ধ হয়ে গেছে। মৎস্য অধিদপ্তর ১০৩টি অনাপত্তি সনদ (এনওসি) বাতিল করায় বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) থেকে ভারতীয় ইলিশের আমদানি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) মৎস্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনকের স্বাক্ষর করা চিঠিতে ১০৩টি অনাপত্তি সনদ বাতিল করা হয়। এরপরই ভারত থেকে ইলিশ আনার প্রক্রিয়া থেমে যায়। তবে ঠিক কী কারণে এসব এনওসি বাতিল করা হয়েছে, সে বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো কারণ জানানো হয়নি।
বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে সরবরাহ ও দামের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক কম দামে ভারত থেকে ইলিশ এনে দেশের বাজারে বিক্রি শুরু করেন। বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে জুলাই ও আগস্ট এই দুই মাসে ৩৫০ টনের বেশি ইলিশ আমদানির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনুমোদন নিয়েই ব্যবসায়ীরা এসব মাছ দেশে আনছিলেন।
আমদানিকারকদের জন্য মূল আকর্ষণ ছিল দামের পার্থক্য। ভারত থেকে প্রতি কেজি ইলিশের ক্রয়মূল্য সর্বোচ্চ প্রায় দুই মার্কিন ডলার বা তারও কম পড়ছিল। শুল্ক, কর ও অন্যান্য ব্যয় যোগ করার পরও দেশীয় বাজারের তুলনায় আমদানি করা ইলিশের দাম কম থাকায় ব্যবসায়ীরা এতে লাভের সুযোগ দেখছিলেন।
তবে বেনাপোল ও যশোরের বাজারে এ নিয়ে ভিন্ন ধরনের অভিযোগও সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, আমদানি করা ইলিশকে অনেক ক্ষেত্রে ‘পদ্মার ইলিশ’ বা দেশি ইলিশ হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে প্রায় ৫০০ টাকা কেজিতে আমদানি করা মাছ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রির অভিযোগ উঠে এসেছে।
ভারতীয় ইলিশের সঙ্গে বাংলাদেশের ইলিশের বাহ্যিক মিল থাকায় বাজারে ক্রেতাদের বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ ক্রেতার পক্ষে মাছের উৎস চেহারা দেখে নিশ্চিতভাবে বোঝা কঠিন হওয়ায় আমদানি করা ইলিশকে দেশি ইলিশ হিসেবে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। সাম্প্রতিক বাজার তদারকিতে ভারতীয় ইলিশ বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে কয়েকজন বিক্রেতাকে জরিমানা করার তথ্যও পাওয়া গেছে। ফলে বিষয়টি শুধু আমদানি-বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও।
অন্যদিকে, আমদানি করা ইলিশের সরবরাহ বাড়লে দেশীয় ইলিশের বাজারে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, সেটিও আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, বিদেশি ইলিশ সহজলভ্য হলে দেশীয় ইলিশ আহরণে জেলেদের আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া আমদানির সময় মাছের প্রকৃত মূল্য কম দেখানো হলে ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’-এর মাধ্যমে অর্থ পাচারের সুযোগ তৈরি হতে পারে এমন আশঙ্কার কথাও বলেছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ। তবে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট আমদানিকারকের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ বা তদন্তের তথ্য কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেনি।
হঠাৎ করে ইলিশ আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। ভারত থেকে কেনা কিছু ইলিশের চালান ইতোমধ্যে সেখানে প্রস্তুত ছিল বলে জানিয়েছেন আমদানিকারকেরা। এখন সেগুলো কম দামে ফেরত দিতে হলে ক্রয়মূল্যের পাশাপাশি আমদানি প্রক্রিয়ায় ব্যয় করা অর্থও লোকসানে পড়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
ইলিশ আমদানিকারক সৈয়েদ মহিদুল হক রুবাই বলেন, ঠাৎ আমদানি বন্ধ করায় আমরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছি। ওপারে আমাদের কেনা ইলিশ রাখা হয়েছিল। এখন কম দামে তা ফেরত দিতে হবে। এর সঙ্গে আমদানি প্রক্রিয়ায় যে খরচ হয়েছে, সেটিও লোকসান হবে।
বেনাপোলের মৎস্য ও মান নিয়ন্ত্রণ অফিসের পরিদর্শক আসাওয়াদুল ইসলাম বলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছে। আমদানি বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে বেনাপোলের বাজারে ভারতীয় ইলিশের সরবরাহও থেমে গেছে। এখন ব্যবসায়ীদের নজর মৎস্য অধিদপ্তরের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশে মোট ১ হাজার ৭৩৯ দশমিক ৫০ টন ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে মঙ্গলবার পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দেশে এসেছে ৫৩৫ মেট্রিক টন। ১০৩টি অনাপত্তি সনদ বাতিল হওয়ার পর এখন প্রশ্ন উঠেছে অন্য অনুমোদনের আওতায় থাকা ইলিশের চালান দেশে আনার সুযোগ থাকবে কি না। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন আমদানিকারকেরা।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের বাজারে ভারতীয় ইলিশের প্রবেশের যে প্রক্রিয়া সম্প্রতি গতি পেয়েছিল, ১০৩টি এনওসি বাতিলের মাধ্যমে আপাতত তাটতে ছেদ পড়েছে। এখন আমদানি পুরোপুরি বন্ধ থাকবে, নাকি অবশিষ্ট অনুমোদনের বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত আসবে সেদিকেই তাকিয়ে আছেন বেনাপোলের ব্যবসায়ীরা।
প্রকাশক : আরিফ মাহমুদ, প্রধান সম্পাদক : কাজী আবু ইমরান, সম্পাদক : আবু রায়হান মিকাঈল
ফেসবুক পেইজঃ facebook.com/kalaroanewsofficial, ই-মেইল : [email protected]