
৮ জুন, বিশ্ব সমুদ্র দিবস। এবারের সমুদ্র দিবসের মূল সুর ও প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত জেলা সাতক্ষীরার উপকূলবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সাথে সমুদ্রের গভীর মিতালি রয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালতের ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে ১ লক্ষ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার রাষ্ট্রীয় সমুদ্র এলাকায় বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠার পর থেকে ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতি শব্দবন্ধটি আমাদের উন্নয়ন ভাবনায় নতুন আশার আলো জাগিয়েছে। আর এই সম্ভাবনার ফ্রন্টলাইনে রয়েছে সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ উপকূল।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা সরাসরি বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূলে অবস্থিত। এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরের এই মোহনা কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধারই নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক নীল অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারে। সমুদ্রের নোনা জলের এই প্রাচুর্যকে কাজে লাগিয়ে সাতক্ষীরা জেলা দেশের অন্যতম প্রধান মৎস্য উৎপাদনকারী অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এখানকার উৎপাদিত বাগদা চিংড়ি বা ‘সাদা সোনা’ এবং সুস্বাদু কাঁকড়া আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। সমুদ্র ও সংলগ্ন খাঁড়িগুলো থেকে আহরিত এই সম্পদ স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখছে।
তবে নীল অর্থনীতির এই বিপুল সম্ভাবনার বিপরীতে সাতক্ষীরা উপকূলের রয়েছে এক রূঢ় বাস্তবতার গল্প। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম সারির শিকার এই অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষ। সিডর, আইলা, আম্পান থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের ঘূর্ণিঝড় রেমালের মতো একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত সইতে হয় এই জনপদকে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জোয়ারের তীব্রতায় উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। এর ফলে একদিকে যেমন কৃষি জমি ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে দেখা দিচ্ছে তীব্র সুপেয় পানির সংকট। সাগরের রুদ্ররূপের কাছে প্রতিনিয়ত নদী ভাঙনে ভিটেমাটি হারাচ্ছে হাজারো পরিবার।
বিশ্ব সমুদ্র দিবসের এই লগ্নে আমাদের ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে—কীভাবে সমুদ্রের সম্পদকে টেকসই উপায়ে ব্যবহার করে উপকূলের এই মানুষগুলোর জীবনমান উন্নয়ন করা যায়। সাতক্ষীরা উপকূলে সুনীল অর্থনীতির সুফল পেতে হলে প্রথমে আমাদের প্রথাগত চিংড়ি বা কাঁকড়া চাষের বাইরে গিয়ে সামুদ্রিক শৈবাল (Seaweed) চাষ এবং আধুনিক মৎস্য আহরণ প্রযুক্তির দিকে নজর দিতে হবে। বঙ্গোপসাগরের তলদেশের খনিজ সম্পদ উত্তোলনে গবেষণার পরিধি বাড়াতে হবে। এর পাশাপাশি, সুন্দরবন সংলগ্ন মান্দারবাড়িয়া সৈকতের মতো সম্ভাবনাময় উপকূলীয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে গড়ে তুলতে পারলে তা স্থানীয় অর্থনীতিতে এক বিশাল বিপ্লব ঘটাতে পারে।
সমুদ্র আমাদের যেমন অঢেল সম্পদ দেয়, তেমনি তার সুরক্ষার দায়িত্বও আমাদের। প্লাস্টিক বর্জ্য ও রাসায়নিক দূষণ থেকে বঙ্গোপসাগরকে মুক্ত রাখা এখন সময়ের দাবি। একই সাথে, সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং ম্যানগ্রোভ বনের কৃত্রিম জলছাপ তৈরি করা, যা সাগরের জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করবে।
সমুদ্রের নীল জলরাশির মাঝেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক মুক্তির চাবিকাঠি। বিশ্ব সমুদ্র দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—সাতক্ষীরা উপকূলের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে বঙ্গোপসাগরের নীল অর্থনীতিকে টেকসইভাবে এগিয়ে নেওয়া। তবেই সুরক্ষিত থাকবে আমাদের উপকূল, সমৃদ্ধ হবে আমাদের বাংলাদেশ।
লেখক :
তারিক ইসলাম।
সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।
প্রকাশক : আরিফ মাহমুদ, প্রধান সম্পাদক : কাজী আবু ইমরান, সম্পাদক : আবু রায়হান মিকাঈল
ফেসবুক পেইজঃ facebook.com/kalaroanewsofficial, ই-মেইল : [email protected]