
মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান : সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, দেবহাটা ও আশাশুনি এলাকার বিশাল অংশজুড়ে বাস করে মুন্ডা, ঋষি, কায়পুত্র ও জেলে সম্প্রদায়। যুগ যুগ ধরে এই মানুষগুলো সুন্দরবনের সম্পদ আহরণ, মাছ ধরা, শুকর চরানো, চামড়ার কাজ এবং কৃষিশ্রমের ওপর ভর করে টিকে রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং আধুনিক সভ্যতার করাল গ্রাসে তাদের এই ঐতিহ্যবাহী পেশাগুলো আজ চরম সংকটের মুখে। নোনা পানির আগ্রাসন আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় এখন এই প্রান্তিক মানুষদের নিত্যসঙ্গী।
সমাজের মূলধারা এবং মানসম্মত শিক্ষা থেকে দূরে থাকায় এই জনগোষ্ঠী দীর্ঘকাল ধরে নানামুখী সামাজিক বঞ্চনার শিকার। তাদের সবচেয়ে বড় ক্ষত হলো ভূমির অধিকারহীনতা। এদের একটি বিশাল অংশের নিজস্ব কোনো চাষের জমি নেই। ফলে বাপ-দাদার ভিটে হারিয়ে অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। এই চরম অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে তাদের আগামী প্রজন্মের ওপর। পড়াশোনার খরচ জোগাতে না পেরে শত শত সন্তান স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে। শৈশবেই তারা নামতে বাধ্য হচ্ছে সুন্দরবনের বাঘ-কুমিরের মুখে ঝুঁকিপূর্ণ উপার্জনে। অন্যদিকে, চরম অভাবের কারণে কন্যাশিশুরা শিকার হচ্ছে বাল্যবিয়ের। পুষ্টিহীনতা এবং সুপেয় পানির তীব্র সংকট তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে।
অবশ্য আশার কথা হলো, বর্তমানে সরকারি ও কিছু বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিতে কিছু কাজ শুরু হয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের সমুদ্রে বিন্দুমাত্র। এত শত প্রতিকূলতা, রাষ্ট্রীয় অবহেলা আর তীব্র দারিদ্র্যের মাঝেও মুন্ডা ও ঋষি সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও হাজার বছরের বর্ণিল ঐতিহ্যকে বুকে ধরে টিকিয়ে রেখেছে। তাদের এই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই আমাদের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে।
এই বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান পরিবর্তন করতে হলে কেবল সাময়িক ত্রাণ বা খয়রাতি অনুদান যথেষ্ট নয়। তাদের জীবনের টেকসই মানোন্নয়নে প্রয়োজন স্থায়ী পুনর্বাসন, নিজস্ব ভূমির আইনি অধিকার এবং জলবায়ু-সহনশীল বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি এখনই সচেতন না হয়, তবে এই মাটির সন্তানরা একদিন নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যাবে। একটি প্রকৃত বৈষম্যহীন ও সাম্যের বাংলাদেশ গড়তে এই প্রান্তিক মানুষের মানবিক অধিকার রক্ষা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
প্রকাশক : আরিফ মাহমুদ, প্রধান সম্পাদক : কাজী আবু ইমরান, সম্পাদক : আবু রায়হান মিকাঈল
ফেসবুক পেইজঃ facebook.com/kalaroanewsofficial, ই-মেইল : [email protected]