
হেলাল উদ্দিন, রাজগঞ্জ : প্রযুক্তির এই দ্রুতগতির যুগে যখন অধিকাংশ মানুষ স্মার্টফোনের পর্দায় ডুবে সময় কাটাচ্ছেন, তখনও যশোরের মণিরামপুর উপজেলার চাকলা গ্রামের একটি ছোট্ট চায়ের দোকানে প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই দেখা মেলে ভিন্ন এক জীবনের। সেখানে নেই মোবাইল ফোনে মুখ গুঁজে থাকার ব্যস্ততা, নেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোলাহল। আছে শুধু এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা, প্রাণখোলা গল্প আর হৃদয়ের টানে একে-অপরের পাশে বসে গল্প করার নির্মল আনন্দ।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে- সারাদিন মাঠে-ঘাটে, কৃষিকাজে কিংবা বিভিন্ন পেশায় কঠোর পরিশ্রম শেষে সন্ধ্যার পর গ্রামের খেটে খাওয়া, সৎ ও পরিশ্রমী মানুষজন একে একে জড়ো হন মোড়ের এই চায়ের দোকানে। ছোট্ট দোকানটি তখন পরিণত হয় গ্রামের এক অনানুষ্ঠানিক মিলনমেলায়। দিনের ক্লান্তি যেন এক কাপ চায়ের ধোঁয়ার সঙ্গে মিলিয়ে যায়। গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেন সবাই। কেউ গ্রামের পুরোনো দিনের স্মৃতি বলেন, কেউ কৃষিকাজের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেন, আবার কেউ টেলিভিশনে খবর বা খেলা দেখতে দেখতে গল্পে মেতে ওঠেন।
লক্ষ করা গেছে- নিয়মিত আড্ডায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষের বয়স ৫০ বছরের বেশি। তাদের হাতে কোনো স্মার্টফোন তো দূরের কথা, অনেকের কাছেই সাধারণ মোবাইল ফোনও নেই। আধুনিক প্রযুক্তির জটিলতা নয়, মানুষে মানুষে সম্পর্কই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় সম্পদ। তারা হয়তো স্মার্টফোনের নানা সুবিধা সম্পর্কে তেমন জানেন না, কিন্তু ভালো করেই জানেন-একসঙ্গে বসে গল্প করার আনন্দ, খোঁজখবর নেওয়ার মানবিকতা আর আপনজনের পাশে থাকার মূল্য কতটা গভীর।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল জলিল (৬৩) বলেন- সারাদিন মাঠে কাজ করি। সন্ধ্যায় এখানে এসে এক কাপ চা খাই, সবার সঙ্গে গল্প করি। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। মোবাইল নিয়ে বসে থাকার চেয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলতেই বেশি ভালো লাগে।
দিনমজুর মো. নুর ইসলাম (৫৮) বলেন- আমরা বেশি কিছু বুঝি না। এই দোকানে সবাই মিলে বসে গল্প করি, খবর দেখি। হাসি-আনন্দে সময় কেটে যায়। এটাই আমাদের বিনোদন।
প্রবীণ বাসিন্দা হরিপদ বিশ্বাস (৬৮) বলেন- আগে যেমন সন্ধ্যা হলেই সবাই এক জায়গায় বসত, এখনও আমরা সেই অভ্যাস ধরে রেখেছি। এখনকার ছেলেমেয়েরা মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু মানুষে মানুষে যে সম্পর্ক, সেটার আনন্দ মোবাইলে পাওয়া যায় না।
স্থানীয়দের মতে- এই চায়ের দোকান শুধু চা বিক্রির স্থান নয়; এটি গ্রামের সামাজিক বন্ধনের অন্যতম কেন্দ্র। এখানে ধনী-গরিব, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থানের কোনো বিভেদ নেই। সবাই একই বেঞ্চে বসে চা পান করেন, গল্প করেন এবং একে-অপরের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করেন।
ডিজিটাল যুগের অগ্রযাত্রার মধ্যেও চাকলা গ্রামের এই চায়ের দোকান যেন অতীতের এক জীবন্ত স্মৃতি বহন করে চলেছে। এখানে ধন-সম্পদ নয়, হৃদয়ের সম্পর্কই সবচেয়ে বড় পরিচয়। ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও আপনজনের টানেই আজও বেঁচে আছে গ্রামের সেই চিরচেনা রাতের আড্ডা-যেখানে এক কাপ চায়ের উষ্ণতায় জেগে ওঠে মানবিকতার অনন্য গল্প।
প্রকাশক : আরিফ মাহমুদ, প্রধান সম্পাদক : কাজী আবু ইমরান, সম্পাদক : আবু রায়হান মিকাঈল
ফেসবুক পেইজঃ facebook.com/kalaroanewsofficial, ই-মেইল : [email protected]