
স্থানীয় নাম ‘জাতা’। ডাল মাড়াই করার ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ উপকরণ। একসময় গ্রামবাংলার কৃষিজীবনের অপরিহার্য সেই ‘জাতা’ কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত নন। মূলত ডাল মাড়াইয়ের উপকরণ হলেও জাতা দিয়ে অন্যান্য ছোট খাদ্য সামগ্রিও মাড়াই করা হতো।
প্রবীণরা জানান, জাতাকল মূলত একটি পাথরের উপরের আরেকটি পাথরে ঘর্ষনে দুই পাথরের মাঝে রাখা ডাল মাড়াই পদ্ধতি। তারা জানান, গোলাকার দুটি পাথর খন্ড উপর-নিচ রাখা হয়। দুটির মাঝ বরাবর থাকার ছিদ্রে কাঠের কাঠি সংযুক্ত থাকে, যাতে চাকার মতো ঘুরতে পারে। উপরের পাথরখন্ডটির এককোণে ছোট্ট গর্ত রাখা হয়, যেখানে লাঠি দিয়ে উপরের জাতাটি চাকার মতো ঘুরাতে হয়। এছাড়াও উপরের পাথর খন্ডের মধ্যভাগের পাশের একস্থানে ২ইঞ্চির মতো কাটা থাকে, যেখান দিয়ে ডাল দেয়া হয়। ডাল দেয়ার পর লাঠি দিয়ে উপরের জাতাটা জোড়ে ঘুরাতে হয়। কিছুক্ষণ পর দুই পাথরের ফাঁক দিয়ে মাড়াই করা ডাল বের হয়।
আশি বছর বয়সী লিয়াকত আলী জানান, কয়েক যুগ আগেও ফসল কাটার পর গ্রামের উঠোন বা খোলা স্থানে পরিবার ও প্রতিবেশীরা একসঙ্গে জড়ো হয়ে ডাল মাড়াই করতেন। এটি শুধু কৃষিকাজই নয়, ছিল এক ধরনের সামাজিক মিলনমেলা। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন হারিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, আগে গরু দিয়ে দলাই, লাঠি দিয়ে পিটিয়ে বা পায়ে মাড়িয়ে ডাল থেকে শস্য আলাদা করা হতো। এ সময় গ্রামীণ গান, গজল, হাসি-আড্ডায় মুখর থাকতো পুরো পরিবেশ। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এই শ্রমসাধ্য পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে।
অহিদুজ্জামানসহ কয়েকজন কৃষক জানান, এখন মাড়াই মেশিন ব্যবহার করলে সময় ও শ্রম দুটোই বাঁচে। ফলে দ্রুত কাজ শেষ করা সম্ভব হয়। তবে এর ফলে গ্রামীণ ঐতিহ্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার সেই বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে।
প্রবীণদের মতে, ডাল মাড়াই ছিল শুধু কাজ নয়, ছিল আনন্দের অংশ। এখন মেশিনের শব্দে সেই আনন্দ হারিয়ে গেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত নয়।
তারা মনে করেন, আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি গ্রামীণ ঐতিহ্য সংরক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। গ্রামবাংলার শিকড়ে থাকা ডাল মাড়াইয়ের মতো ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে কৃষির ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মুছে যাবে। তাই সময় থাকতে এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও সচেতনতার মাধ্যমে এই হারিয়ে যাওয়া চর্চাগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
প্রকাশক : আরিফ মাহমুদ, প্রধান সম্পাদক : কাজী আবু ইমরান, সম্পাদক : আবু রায়হান মিকাঈল
ফেসবুক পেইজঃ facebook.com/kalaroanewsofficial, ই-মেইল : [email protected]