শুক্রবার, অক্টোবর ২, ২০২৬
প্রধান ম্যেনু

সাতক্ষীরা, দেশ ও বিশ্বের সকল সংবাদ, সবার আগে

প্লাস্টিকের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশের তৈরি পণ্য

একসময় সাতক্ষীরার গ্রামীণ জীবনে বাঁশ-বেতের তৈরি হাতপাখা, কুলা, ডালি, ঝুড়ি, চালুনি কিংবা মাছ ধরার সরঞ্জাম ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। ঘর-গৃহস্থালি থেকে কৃষিকাজ, এমনকি মাছ ধরার কাজেও এসব পণ্যের ছিল ব্যাপক ব্যবহার। সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের চাহিদাও। সস্তা ও সহজলভ্য প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে সেই জায়গা এখন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্প এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কারিগরদের জীবন-জীবিকা।

সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কোরাপাক্রাতলা গ্রামের সড়কের পাশে বসে বাঁশের চিকন শলা দিয়ে ঝুড়ি তৈরি করছিলেন ৬৫ বছরের বেশি বয়সী বিশ্বনাথ দাস। অভিজ্ঞ হাতে একের পর এক বাঁশের ফালি বুনে তৈরি করছেন ঝুড়ি।

বিশ্বনাথ দাস বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেইক্যা এই কাম কইরা আসতেছি। এইডাই আমাগের ব্যবসা।’ তিনি আরও বলেন, একটা ঝুড়ি তৈরি করে ১৫০ টাকায় বিক্রি করি। এতে বাঁশ ও অন্যান্য খরচ পড়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ টাকা। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কাজ করে সর্বোচ্চ দুটি ঝুড়ি তৈরি করা যায়। আয় কম হলেও সংসারের কথা ভেবে পেশাটি ধরে রেখেছি। কাজ না করলে সংসার চলবে না। তাই কষ্ট হলেও করে যাচ্ছি।

দেবহাটা এলাকার আরেক কারিগর পঞ্চরঞ্জন দাসের জীবনেও একই গল্প। প্রায় ৭০ বছর ধরে তাদের পরিবার বাঁশের এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখলেও এখন আর এতে আগের মতো লাভ নেই। কোনোরকমে সংসার চালিয়ে নিতে হচ্ছে তাকে।

পঞ্চরঞ্জন দাস বলেন, আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকে এই কাজ করে আসছি। প্রায় ৭০ বছর হবে। এখন আর আমাদের এই কাজের তেমন একটা লাভ নেই। কোনো রকমে সংসার চলে। মাঝে মাঝে ঋণী হয়ে আবার কাজ করি। এভাবেই আমাদের জীবনযাপন।

তিনি জানান, বাঁশের কাজের সামান্য আয় দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থের অভাবে এক ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি বলে জানান তিনি।

পঞ্চরঞ্জন বলেন, ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা করাব কীভাবে? একটা ছেলে পড়াশোনা করতে চেয়েছিল, টাকার কারণে পড়াতে পারিনি। সেই ছেলে এখন কাজকাম করে।

তার এই কথাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাঁশের শিল্পে সংকট শুধু একটি পেশার সংকট নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, সন্তানের শিক্ষা এবং পরবর্তী প্রজন্মের জীবন।

কোরাপাক্রাতলা গ্রামের কারিগর অরবিন্দ দাস তৈরি করেন কাঁকড়া ধরার আটন, ঢাকনা, চিংড়ি ধরার খোলুই, মাটির ঝুড়ি, কাবড়া ও কুলাসহ বিভিন্ন পণ্য। তার ভাষ্য, গ্রামে প্রায় ৫০ জন মানুষ বাঁশের কাজের সঙ্গে যুক্ত।

তবে কাজ থাকলেও আগের মতো বাজার নেই। প্লাস্টিকের তৈরি ঝুড়ি, কুলা, ডালি ও অন্যান্য সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় বাঁশের পণ্যের চাহিদা কমেছে। একই সময়ে বেড়েছে বাঁশ ও উৎপাদন খরচ।

কারিগর স্বপন দাস জানান, বর্তমানে একটি বাঁশ কিনতেই ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। কিন্তু তৈরি পণ্যের দাম সেই অনুপাতে বাড়ছে না। তার দাবি, স্বল্প সুদে বা সুদমুক্ত ঋণ এবং সরকারি সহায়তা পেলে এই পেশার মানুষগুলো টিকে থাকতে পারবেন।

দেবহাটা উপজেলা পরিষদের সামনের সড়কে ভ্যানে করে বাঁশের পণ্য বিক্রি করেন ৬০ বছরের বেশি বয়সী রবিন দাস। প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তার ভ্যানে থাকে টাবরা, কুলা, ডালি, টোকা, ধামা-পালিসহ বিভিন্ন পণ্য।

রবিন দাস বলেন, একটা টাবরা ১৮০ টাকায় কিনে ২০০ টাকায় বেচি। এই ব্যবসা দিয়েই সংসার চালাই।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুর বাজারে বাঁশের পণ্য বিক্রি করেন কানাই কুমার। তিনি বলেন, ব্যবসা শুরুর সময় প্লাস্টিকের ব্যবহার এতটা ছিল না। গত পাঁচ বছরে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাঁশের পণ্যের বাজার অনেকটাই কমেছে।

কানাই কুমার বলেন, প্রথম যখন এই ব্যবসা শুরু করেছিলাম, তখন তেমন একটা প্লাস্টিক ছিল না। পাঁচ বছর ধরে প্লাস্টিক বেশি ব্যবহার হচ্ছে। ২০২৪ সালে প্রায় ২ লাখ টাকার মতো লস খেয়েছি। এই ব্যবসা আগের মতো ভালো নেই। না করলে তো কিছু করার নেই।

বাজারে পণ্য বিক্রি না হওয়ায় কারিগর ও বিক্রেতা দুই পক্ষই পড়েছেন সংকটে। অনেকেই সমিতি ও সুদের টাকা নিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।

কানাই বলেন, আমরা যদি হাটে-বাজারে বিক্রি করতে না পারি, তাহলে টাকা কোথা থেকে দেব? এখন আমাদের দিন আনা-দিন খাওয়া চলছে। সমিতির টাকা, সুদের টাকা নিয়ে আমরা ঋণগ্রস্ত হয়ে আছি।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার চিংড়ি, ফয়জুল্লাহপুর, দেবহাটার কাজীরহাট, বিষ্ণুপুর, পারুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনও বাঁশের পণ্য তৈরি হয়। কিন্তু চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক কারিগর বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন।

কানাই কুমার বলেন, যারা তৈরি করছেন, তাদেরও দুরবস্থা। এখন তাদের দিন চলে না। তারা এখন এসব কাজ ছেড়ে দিয়ে ভ্যান চালাচ্ছেন। আমিও তো ভ্যান চালাই। সকালে-বিকেলে এসব মালামাল বিক্রি করি, অন্যরকম বাজার-ঘাট করার মতো।

প্লাস্টিক এমনিতেই ক্ষতিকর। প্লাস্টিক যদি না উঠত, তাহলে আমাদের কারিগর যারা রয়েছে, তারাও ভালোভাবে চলতে পারত।

বাঁশের পণ্য তৈরির পুরো প্রক্রিয়াতেই রয়েছে শ্রম ও সময়ের ব্যাপার। বাঁশ কেটে দা বা ছুরি দিয়ে চিকন ফালি তৈরি করা হয়। পরে রোদে শুকিয়ে সেই ফালি বুনে তৈরি করা হয় ঝুড়ি, কুলা, ডালি, চালুনিসহ নানা পণ্য। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শেখা এই কাজ এখনো ধরে রেখেছেন অনেকে। কিন্তু নতুন প্রজন্মের মধ্যে এ পেশার প্রতি আগ্রহ কমছে।

কালীগঞ্জের কারিগর মো. হোসাইন আলী বলেন, বাপ-দাদার পেশা, তাই ধরে আছি। কিন্তু ছেলে-মেয়েরা আর এই কাজ করতে চায় না। পরিশ্রম বেশি, লাভ কম। চাহিদাও আগের মতো নেই।

সাতক্ষীরা বিসিকের প্রচার কর্মকর্তা পীযূষ ঘোষ বলেন, জেলার অনেক মানুষ বাঁশ ও বেতের কুটিরশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও ঋণের সুযোগ রয়েছে। তবে সরকারি চাকরিজীবী জামিনদারের শর্ত থাকায় অনেক কারিগর ঋণ নিতে পারেন না। ‘একটি পণ্য, একটি গ্রাম’ প্রকল্পের আওতায় এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

কারিগর ও ব্যবসায়ীদের দাবি, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং বাঁশের পণ্যের বাজার বাড়ানোর উদ্যোগ না নিলে এই শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। বাঁশের শলায় বোনা প্রতিটি পণ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাতক্ষীরার গ্রামীণ জীবনের পুরোনো ঐতিহ্য। কিন্তু সেই ঐতিহ্য এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে। একদিকে কমছে পণ্যের চাহিদা, অন্যদিকে বাড়ছে উৎপাদন খরচ ও ঋণের চাপ। ফলে শুধু একটি শিল্পই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু পরিবারের স্বপ্নও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

একই রকম সংবাদ সমূহ

চার দফা দাবিতে সাতক্ষীরায় ভূমিহীনদের পথসভা

চার দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে সাতক্ষীরায় পথসভা করেছেন ভূমিহীনরা। ICT কোচিং সেন্টারবিস্তারিত পড়ুন

সাতক্ষীরায় দারিদ্র নারীদের মাঝে সেলাই মেশিন বিতরণ

দরিদ্র ও পিছিয়েপড়া নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সাতক্ষীরায় সেলাইবিস্তারিত পড়ুন

কলারোয়ায় ৮০জন মেধাবী শিক্ষার্থী বিনামূল্যে পেলো বাইসাইকেল

সাতক্ষীরার কলারোয়ায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে পেলো বাইসাইকেল। সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের উদ্যোগে কলারোয়াবিস্তারিত পড়ুন

  • সাতক্ষীরায় ৩শ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুর মেলা শুরু
  • সাতক্ষীরায় ৩৬তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত
  • ধসে পড়েছে বিদ্যালয়ের ছাদ, ঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা
  • সাতক্ষীরার ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম
  • সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম মিনির ভাইয়ের মৃত্যুতে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের গভীর শোক জ্ঞাপন
  • সাতক্ষীরায় ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের উদ্যোগে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত
  • সাতক্ষীরায় নদীকৃত্য দিবস পালিত, দখল-দূষণমুক্ত জীবন্ত নদীর দাবি
  • তৃতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সাতক্ষীরা রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের আনন্দ র‍্যালি
  • এমপি নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের বাবার আপস
  • শিশুদের নোবেল খ্যাত আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার ২০২৬ এর জন্য মনোনীত হয়েছেন সাতক্ষীরা সুদীপ্ত মুশফিক
  • সাতক্ষীরা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন নিয়ে আইনজীবী ফোরামের আলোচনা সভা
  • সাতক্ষীরায় প্রকাশনা উৎসব, গল্প, কবিতা আবৃত্তি ও স্মৃতির এক সাহিত্যসন্ধ্যা অনুষ্ঠিত