বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২২, ২০২৬
প্রধান ম্যেনু

সাতক্ষীরা, দেশ ও বিশ্বের সকল সংবাদ, সবার আগে

প্লাস্টিকের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশের তৈরি পণ্য

একসময় সাতক্ষীরার গ্রামীণ জীবনে বাঁশ-বেতের তৈরি হাতপাখা, কুলা, ডালি, ঝুড়ি, চালুনি কিংবা মাছ ধরার সরঞ্জাম ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। ঘর-গৃহস্থালি থেকে কৃষিকাজ, এমনকি মাছ ধরার কাজেও এসব পণ্যের ছিল ব্যাপক ব্যবহার। সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের চাহিদাও। সস্তা ও সহজলভ্য প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে সেই জায়গা এখন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্প এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কারিগরদের জীবন-জীবিকা।

সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কোরাপাক্রাতলা গ্রামের সড়কের পাশে বসে বাঁশের চিকন শলা দিয়ে ঝুড়ি তৈরি করছিলেন ৬৫ বছরের বেশি বয়সী বিশ্বনাথ দাস। অভিজ্ঞ হাতে একের পর এক বাঁশের ফালি বুনে তৈরি করছেন ঝুড়ি।

বিশ্বনাথ দাস বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেইক্যা এই কাম কইরা আসতেছি। এইডাই আমাগের ব্যবসা।’ তিনি আরও বলেন, একটা ঝুড়ি তৈরি করে ১৫০ টাকায় বিক্রি করি। এতে বাঁশ ও অন্যান্য খরচ পড়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ টাকা। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কাজ করে সর্বোচ্চ দুটি ঝুড়ি তৈরি করা যায়। আয় কম হলেও সংসারের কথা ভেবে পেশাটি ধরে রেখেছি। কাজ না করলে সংসার চলবে না। তাই কষ্ট হলেও করে যাচ্ছি।

দেবহাটা এলাকার আরেক কারিগর পঞ্চরঞ্জন দাসের জীবনেও একই গল্প। প্রায় ৭০ বছর ধরে তাদের পরিবার বাঁশের এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখলেও এখন আর এতে আগের মতো লাভ নেই। কোনোরকমে সংসার চালিয়ে নিতে হচ্ছে তাকে।

পঞ্চরঞ্জন দাস বলেন, আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকে এই কাজ করে আসছি। প্রায় ৭০ বছর হবে। এখন আর আমাদের এই কাজের তেমন একটা লাভ নেই। কোনো রকমে সংসার চলে। মাঝে মাঝে ঋণী হয়ে আবার কাজ করি। এভাবেই আমাদের জীবনযাপন।

তিনি জানান, বাঁশের কাজের সামান্য আয় দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থের অভাবে এক ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি বলে জানান তিনি।

পঞ্চরঞ্জন বলেন, ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা করাব কীভাবে? একটা ছেলে পড়াশোনা করতে চেয়েছিল, টাকার কারণে পড়াতে পারিনি। সেই ছেলে এখন কাজকাম করে।

তার এই কথাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাঁশের শিল্পে সংকট শুধু একটি পেশার সংকট নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, সন্তানের শিক্ষা এবং পরবর্তী প্রজন্মের জীবন।

কোরাপাক্রাতলা গ্রামের কারিগর অরবিন্দ দাস তৈরি করেন কাঁকড়া ধরার আটন, ঢাকনা, চিংড়ি ধরার খোলুই, মাটির ঝুড়ি, কাবড়া ও কুলাসহ বিভিন্ন পণ্য। তার ভাষ্য, গ্রামে প্রায় ৫০ জন মানুষ বাঁশের কাজের সঙ্গে যুক্ত।

তবে কাজ থাকলেও আগের মতো বাজার নেই। প্লাস্টিকের তৈরি ঝুড়ি, কুলা, ডালি ও অন্যান্য সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় বাঁশের পণ্যের চাহিদা কমেছে। একই সময়ে বেড়েছে বাঁশ ও উৎপাদন খরচ।

কারিগর স্বপন দাস জানান, বর্তমানে একটি বাঁশ কিনতেই ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। কিন্তু তৈরি পণ্যের দাম সেই অনুপাতে বাড়ছে না। তার দাবি, স্বল্প সুদে বা সুদমুক্ত ঋণ এবং সরকারি সহায়তা পেলে এই পেশার মানুষগুলো টিকে থাকতে পারবেন।

দেবহাটা উপজেলা পরিষদের সামনের সড়কে ভ্যানে করে বাঁশের পণ্য বিক্রি করেন ৬০ বছরের বেশি বয়সী রবিন দাস। প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তার ভ্যানে থাকে টাবরা, কুলা, ডালি, টোকা, ধামা-পালিসহ বিভিন্ন পণ্য।

রবিন দাস বলেন, একটা টাবরা ১৮০ টাকায় কিনে ২০০ টাকায় বেচি। এই ব্যবসা দিয়েই সংসার চালাই।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুর বাজারে বাঁশের পণ্য বিক্রি করেন কানাই কুমার। তিনি বলেন, ব্যবসা শুরুর সময় প্লাস্টিকের ব্যবহার এতটা ছিল না। গত পাঁচ বছরে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাঁশের পণ্যের বাজার অনেকটাই কমেছে।

কানাই কুমার বলেন, প্রথম যখন এই ব্যবসা শুরু করেছিলাম, তখন তেমন একটা প্লাস্টিক ছিল না। পাঁচ বছর ধরে প্লাস্টিক বেশি ব্যবহার হচ্ছে। ২০২৪ সালে প্রায় ২ লাখ টাকার মতো লস খেয়েছি। এই ব্যবসা আগের মতো ভালো নেই। না করলে তো কিছু করার নেই।

বাজারে পণ্য বিক্রি না হওয়ায় কারিগর ও বিক্রেতা দুই পক্ষই পড়েছেন সংকটে। অনেকেই সমিতি ও সুদের টাকা নিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।

কানাই বলেন, আমরা যদি হাটে-বাজারে বিক্রি করতে না পারি, তাহলে টাকা কোথা থেকে দেব? এখন আমাদের দিন আনা-দিন খাওয়া চলছে। সমিতির টাকা, সুদের টাকা নিয়ে আমরা ঋণগ্রস্ত হয়ে আছি।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার চিংড়ি, ফয়জুল্লাহপুর, দেবহাটার কাজীরহাট, বিষ্ণুপুর, পারুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনও বাঁশের পণ্য তৈরি হয়। কিন্তু চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক কারিগর বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন।

কানাই কুমার বলেন, যারা তৈরি করছেন, তাদেরও দুরবস্থা। এখন তাদের দিন চলে না। তারা এখন এসব কাজ ছেড়ে দিয়ে ভ্যান চালাচ্ছেন। আমিও তো ভ্যান চালাই। সকালে-বিকেলে এসব মালামাল বিক্রি করি, অন্যরকম বাজার-ঘাট করার মতো।

প্লাস্টিক এমনিতেই ক্ষতিকর। প্লাস্টিক যদি না উঠত, তাহলে আমাদের কারিগর যারা রয়েছে, তারাও ভালোভাবে চলতে পারত।

বাঁশের পণ্য তৈরির পুরো প্রক্রিয়াতেই রয়েছে শ্রম ও সময়ের ব্যাপার। বাঁশ কেটে দা বা ছুরি দিয়ে চিকন ফালি তৈরি করা হয়। পরে রোদে শুকিয়ে সেই ফালি বুনে তৈরি করা হয় ঝুড়ি, কুলা, ডালি, চালুনিসহ নানা পণ্য। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শেখা এই কাজ এখনো ধরে রেখেছেন অনেকে। কিন্তু নতুন প্রজন্মের মধ্যে এ পেশার প্রতি আগ্রহ কমছে।

কালীগঞ্জের কারিগর মো. হোসাইন আলী বলেন, বাপ-দাদার পেশা, তাই ধরে আছি। কিন্তু ছেলে-মেয়েরা আর এই কাজ করতে চায় না। পরিশ্রম বেশি, লাভ কম। চাহিদাও আগের মতো নেই।

সাতক্ষীরা বিসিকের প্রচার কর্মকর্তা পীযূষ ঘোষ বলেন, জেলার অনেক মানুষ বাঁশ ও বেতের কুটিরশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও ঋণের সুযোগ রয়েছে। তবে সরকারি চাকরিজীবী জামিনদারের শর্ত থাকায় অনেক কারিগর ঋণ নিতে পারেন না। ‘একটি পণ্য, একটি গ্রাম’ প্রকল্পের আওতায় এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

কারিগর ও ব্যবসায়ীদের দাবি, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং বাঁশের পণ্যের বাজার বাড়ানোর উদ্যোগ না নিলে এই শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। বাঁশের শলায় বোনা প্রতিটি পণ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাতক্ষীরার গ্রামীণ জীবনের পুরোনো ঐতিহ্য। কিন্তু সেই ঐতিহ্য এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে। একদিকে কমছে পণ্যের চাহিদা, অন্যদিকে বাড়ছে উৎপাদন খরচ ও ঋণের চাপ। ফলে শুধু একটি শিল্পই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু পরিবারের স্বপ্নও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

একই রকম সংবাদ সমূহ

সাতক্ষীরা জেলা ক্রীড়া অফিসের উদ্যোগে ২৪ অক্টোবর থেকে সাঁতার প্রশিক্ষণ শুরু হতে যাচ্ছে

নিজস্ব প্রতিনিধি : সাতক্ষীরায় আগামী ২৪ অক্টোবর থেকে মাসব্যাপী (অ-১৪) ফ্রি সাঁতারবিস্তারিত পড়ুন

সাতক্ষীরার বল্লি ইউনিয়ন চেয়ারম্যান প্রার্থী দিদারুল আলমের পূজা মন্ডপ পরিদর্শন

নিজস্ব প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বল্লি ইউনিয়ন এর চেয়ারম্যান প্রার্থী মোঃবিস্তারিত পড়ুন

সাতক্ষীরায় আলিপুর ইউনিয়নে ‘ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি-২০২৬’-এর শুভ উদ্বোধন

“ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সাতক্ষীরার আলিপুর ইউনিয়নেবিস্তারিত পড়ুন

  • স্বাস্থ্যসেবায় যত্নের ছোঁয়া: সাতক্ষীরা ইসলামী ব্যাংক কমিউনিটি হাসপাতালে সার্ভিস উন্নয়ন সভা অনুষ্ঠিত
  • সাতক্ষীরায় আইনজীবী সমিতির নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের প্রস্তুতি সভা
  • অগ্রগতির জাগরণ প্রকল্পের আওতায় সাতক্ষীরা ও কালীগঞ্জে যুবদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন
  • সাতক্ষীরার বেতনা নদীর তীরে দুই হাজার বৃক্ষরোপণ
  • সাতক্ষীরা পৌরদীঘিতে লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই চলছে রাতের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা
  • সাতক্ষীরায় প্রাইমারির নবনিযুক্ত শিক্ষকদের পদায়নপত্র তুলে দিলেন জেলা প্রশাসক
  • তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে সরকারের পদক্ষেপ জানাতে সাতক্ষীরায় স্বেচ্ছাসেবক দলের লিফলেট বিতরণ
  • সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের প্রশাসক হাবিবের সাথে বাকশিস নবনির্বাচিত নেতৃবৃন্দের মতবিনিময়
  • সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যুবককে পিটিয়ে হত্যা, প্রধান আসামী আমিনী গ্রেপ্তার
  • সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সমন্বিত উদ্যোগ, সাতক্ষীরায় নিরাপদ সড়ক দিবসের প্রস্তুতি সভা
  • দেশব্যাপী হত্যা, শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও মব সহিংসতার প্রতিবাদে সাতক্ষীরায় মানববন্ধন
  • চায়ের কাপে নির্বাচনী ঝড়, সাতক্ষীরার ব্রহ্মরাজপুরে আলোচনার কেন্দ্রে যারা