তাহসিফের মৃত্যু: মিলছে না ৬ প্রশ্নের উত্তর


– কী বলে যেতে পারলেন না তাহসিফ সাউরি?
– বাবার তথ্যমতে, যেখানে তার মরদেহ পাওয়া গেছে, সেখানে কোনো দিন যাননি তিনি। তাহলে সেখানে গেলেন কীভাবে?
– কোন ছোট ভাই তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়েছিলেন?
– সন্ধ্যা থেকে রাত ১টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি মা। সেই সময়টুকুতে তার সঙ্গে কী কী ঘটেছিল?
– হঠাৎ রাত ১টা ৩৫ মিনিটে কে মেসেজ দিয়ে জানিয়েছিল, ‘আসছি’?
– বাবার ভাষ্যমতে, কোন বিষয় নিয়ে আশঙ্কিত ছিলেন তাহসিফ সাউরি?
সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর পর এসব প্রশ্ন নিয়ে বাড়ছে রহস্য। নিখোঁজের এক দিন পর রাজধানীর উপকণ্ঠে তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হয়েছে তার মরদেহ। মৃত্যুর আগে নিজের চাকরি থেকে অব্যাহতি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ এবং ওই সময়ের কিছু ঘটনা নিয়ে কথা বললেও সবকিছু প্রকাশ করেননি তাহসিফ। বলেছিলেন, ‘সবকিছু আমি বলব না। আমারও কিছু অপরাগতা আছে।’ তার সেই না বলা কথাগুলোর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে মৃত্যুরহস্য। পরিবারের দাবি, যেখান থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই এলাকায় কখনো যাননি তিনি। মৃত্যুর কারণ কী, কারা এর সঙ্গে জড়িত, আর নিখোঁজ হওয়ার পরের কয়েক ঘণ্টায় তার সঙ্গে কী ঘটেছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
তাহসিফের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও আলোচনায় এসেছে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার পুরোনো অভিযোগ। তবে ভিডিওটি তাহসিফ ধারণ করেছিলেন বা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, এমন দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। মৃত্যুর সঙ্গে ওই অভিযোগের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তাও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল জানিয়েছেন, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার পর দ্বীপ নামে এক জুনিয়র তার ছেলেকে বাসা থেকে ডেকে নেন। মাকে বলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর ফেরেননি তিনি। পরিবারের সদস্যরা একাধিকবার ফোন করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মেসেজ দিয়ে মাকে জানান, ‘আম্মু, আমি আসছি।’ সেটিই ছিল পরিবারের সঙ্গে তার শেষ যোগাযোগ।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) কালবেলাকে হেলাল বলেন, ঘটনার দিন তাহসিফ প্রায় সারা দিন তার মা হোসনে আরা বিথির সঙ্গে ছিলেন। মা-বাবার জন্য কেনাকাটাও করেছিলেন। সন্ধ্যার পর দ্বীপ নামে তার এক বন্ধু ও জুনিয়র নিচ থেকে ডাকলে মাকে জানিয়ে বেরিয়ে যান। এরপর আর বাসায় ফেরেননি।
হেলাল বলেন, ‘সে অত্যন্ত জেন্টেল প্রকৃতির, অত্যন্ত সোশ্যাল। সিনিয়র-জুনিয়র সবার সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক। যেদিনের ঘটনা, সে সারাদিন তার মায়ের সঙ্গে ছিল, শপিং করেছে, আমার জন্যও কিছু শপিং করেছে। সন্ধ্যার পরে দ্বীপ নামে ওর একটা বন্ধু ছোটভাই ওকে নিচ থেকে ডাকে। সে তার মাকে বলে, মা দ্বীপ আসছে, একটু কথা বলে আসি। এসব বলে নিচে যায়, আর ফেরেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর মধ্যে ওর মা অনেকবার চেষ্টা করেছে, ও ফেরেনি। এবং রাত ১টা ৩৫ মিনিটে সে মেসেজ দিয়েছে, সে আসছে। আম্মু আমি আসছি, এই রকম একটা মেসেজ দিয়েছে। এরপর থেকে তাকে আর লোকেট করতে পারিনি।’
ছেলেকে খুঁজতে বুধবার দুপুরের দিকে তুরাগ থানায় গিয়েছিলেন বলে জানান হেলাল। তার ভাষ্য, পুলিশ তখন তাকে আশ্বস্ত করেছিল। কিন্তু ওই দিন বিকেলেই উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফোন করে তার ছেলের মরদেহ উদ্ধারের খবর জানান।
হেলাল বলেন, ‘আমি তুরাগ থানায় গিয়েছিলাম বুধবার দুপুরের দিকে। তারা (তুরাগ থানা) বললেন, এমন কোনো ব্যাড নিউজ নাই, আপনি নিশ্চিন্ত থাকেন। সন্ধ্যার আগে, সোয়া ৫টার দিকে উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমার সঙ্গে কথা বললেন। আমার নাম, ছেলের নাম নিশ্চিত হয়ে তারপর আমাকে জানালেন যে, নদীতে ডেডবডি পাওয়া গেছে।’
মরদেহ উদ্ধারের স্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এটা হলো রাজাবাড়ির ঘাটে। আটিপাড়া দিয়ে যেতে হয়। ওই এলাকায় আমার ছেলে কখনো যায়নি। এখন কারা বা কে তাকে হত্যা করেছে, এটা আমি জানি না।’
তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যার অভিযোগের পাশাপাশি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণও গুরুত্বপূর্ণ। ময়নাতদন্ত ও তদন্তের ফল ছাড়া তার মৃত্যুকে হত্যা বলে নিশ্চিত করার সুযোগ নেই। তবে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময়কাল এবং মরদেহ উদ্ধারের স্থান নিয়ে বাবার বক্তব্য ঘটনায় নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিমানবাহিনী থেকে তাহসিফের অব্যাহতির সঙ্গে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা নিয়ে তার বাবা বলেন, পরিবারকে এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।
হেলাল বলেন, ‘৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পলায়নের ভিডিও শেয়ার করার কারণে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল কি না, এটা সে আদৌ করেছে কি না, সে বিষয়ে আমাদের জানায়নি। এটা তার ডিপার্টমেন্ট বলতে পারবে। ওর ডিপার্টমেন্ট আমাদের সিম্পলি জানিয়েছে, এটা ডিসিপ্লিন অর্গানাইজেশন, ওর ইনডিসিপ্লিনারি কাজের কারণে ওকে ইস্তফা দেওয়া হয়েছে।’
তাহসিফ কোনো হুমকি পেয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সে হুমকি-ধামকির বিষয়ে আমাদের কিছু বলেনি। সে বলেছিল যে, সে একটু আশঙ্কা করছে। হুমকি বা থ্রেটের বিষয়ে সে কিছুই বলেনি।’
হেলালের ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতির পর তাহসিফ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, নেত্র নিউজ হয়ে সর্বশেষ ভার্গো টোব্যাকোতে কর্মরত ছিলেন তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও তাহসিফ ধারণ করেছিলেন বা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, এমন আলোচনা আগে থেকেই ছিল। তবে এ বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। মৃত্যুর প্রায় তিন মাস আট দিন আগে প্রকাশিত একটি পডকাস্টে তাহসিফ নিজেই অভিযোগটিকে ‘প্রমাণহীন অভিযোগ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন।
গত ২১ জুলাই ‘স্পিক উইথ রশিদ’ নামের একটি চ্যানেলে প্রকাশিত ওই পডকাস্টে নিজের চাকরি ও বিমানবাহিনীর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন তিনি। তাকে নিয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনকেও প্রোপাগান্ডা বলে দাবি করেন তাহসিফ।
সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে উপস্থাপক শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করেন। জবাবে তাহসিফ বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে ভিডিওটি তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হলেও, ভিডিওটি তিনিই ধারণ করেছেন, এমন দাবি করা হয়নি। এ অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সঙ্গে এই অভিযোগের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, জানতে চাইলে তাহসিফ বলেন, এমনটি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে সবকিছু প্রকাশ করতে পারবেন না বলেও জানান তিনি। তার ভাষায়, ‘যে ঘটনাগুলো ৫ আগস্টের আগে-পরে ঘটেছিল। সবকিছু আমি বলব না। আমারও কিছু অপরাগতা আছে।’
এদিকে, নিজেকে তাহসিফের বন্ধু দাবি করা বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কর্মরত কে এস এম ইনতিসার ইনজামামও নিজের ফেসবুকে একটি বক্তব্য দিয়েছেন। সেখানে তিনি শেখ হাসিনার হেলিকপ্টারে দেশত্যাগের ভিডিও ফাঁসের ঘটনার সঙ্গে তাহসিফের মৃত্যুর যোগসূত্র থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং ঘটনাটিকে রাজনৈতিক বলে মনে করেন। তবে তার এই বক্তব্য সন্দেহ ও ব্যক্তিগত ধারণার ভিত্তিতে দেওয়া। এর স্বাধীন কোনো প্রমাণ যাচাই করতে পারেনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে উত্তরখান থানার দায়িত্বরত এক কর্মকর্তা এ তথ্য জানান।
নৌ-পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরের মাধ্যমে খবর পেয়ে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা উত্তরখান থানাধীন রাজাবাড়ি ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে পৌঁছান। পরে সেখান থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারের সময় তার পরনে ছিল সাদা পাজামা ও কালো জামা। হাতে ঘড়ি এবং পকেটে আইফোন পাওয়া যায়। পরে সঙ্গে থাকা আইফোনের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
কালবেলা
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

‘আম্মু আমি আসছি’ শেষ মেসেজ পাঠিয়েছিলেন তাহসিফ
রাজধানীর উত্তরখানে তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হওয়া তাহসিফ সাউরির নিখোঁজ হওয়ার আগেরবিস্তারিত পড়ুন

মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলা: মাহবুব উল আলম হানিফের মৃত্যুদণ্ড
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উলবিস্তারিত পড়ুন

ইউপি নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনে প্রার্থিতা বাতিল, সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে আচরণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচন কমিশনবিস্তারিত পড়ুন


