থানা থেকে এক কিলোমিটার দূরে মাদকের স্বর্গরাজ্য শার্শার ত্রিমোহনী


মাদক নির্মূলে সরকারের কঠোর অবস্থানের মধ্যেও যশোরের শার্শা সদর ইউনিয়নের শ্যামলাগাছীর ত্রিমোহনী এলাকায় থামছে না মাদকের কারবার। উপজেলা সদর ও শার্শা থানা থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরের এ এলাকায় প্রকাশ্য ও গোপনে গাঁজা, ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের বেচাকেনা চলছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। মাঝে মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও বেশিরভাগ মাদক কারবারি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় মাদকের বিস্তার বন্ধ হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ত্রিমোহনী গ্রামের বিভিন্ন অলিগলি, চায়ের দোকানের পেছনের অংশ এবং আশপাশের বিভিন্ন বাগানকে মাদক কেনাবেচার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। দিনের পাশাপাশি রাতেও এসব স্থানে মাদক বেচাকেনা চলে বলে স্থানীয়দের দাবি। গাঁজা, ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য সহজেই পাওয়া যাচ্ছে বলে জানা গেছে।মাদক কারবারিরা বিভিন্ন কৌশলে ক্রেতাদের কাছে মাদক পৌঁছে দিচ্ছে। ফলে ত্রিমোহনী এলাকায় মাদকের সহজলভ্যতা দিন দিন বাড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ত্রিমোহনী এলাকায় মাদক কারবারের সঙ্গে একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে। মৃত আব্দুল মতিন গাজীর ছেলে শাহাজালাল (৬৩), তার ছেলে সাব্বির আহমেদ এবং শাহাজালালের ভাইপো মৃত রাজ্জাকের ছেলে সাগর হোসেন মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর শাহাজালালের নিজ বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মাদকদ্রব্যসহ তার ছেলে সাব্বির হোসেনকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় শার্শা থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয় এবং তাকে আদালতে পাঠানো হয়। পরে জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে সাব্বিরের বিরুদ্ধে। এর পর ২০২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মাদকসহ আবারও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।একই পরিবারের শাহাজালালের ভাইপো সাগর হোসেনের বিরুদ্ধেও মাদকসংক্রান্ত একাধিক ঘটনায় জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০২৬ সালের ১০ মে এবং ২৫ সেপ্টেম্বর পৃথক ঘটনায় মাদকসহ তাকে আটক করা হয়। বর্তমানে সাব্বির ও সাগর দুজনই কারাগারে রয়েছেন বলে জানা গেছে। একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার, তারপরও থামেনি কারবারি
এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত আর এক ব্যবসায়ী মৃত আতিয়ারের ছেলে আতাউরের নামও স্থানীয়ভাবে আলোচিত। তার বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ১৭ মে, ২০১৬ সালের ১৮ মে, ২০২০ সালের ৫ নভেম্বর, ২০২৩ সালের ২২ জানুয়ারি, ২০২৩ সালের ২৫ জুলাই এবং ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই বিভিন্ন সময়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একাধিকবার গ্রেপ্তার ও মামলা হওয়ার পরও এলাকায় মাদক কারবারের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। একই এলাকার মৃত শামসুর রহমানের ছেলে টিটনের বিরুদ্ধেও মাদকসংক্রান্ত মামলায় আটকের তথ্য রয়েছে। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১৮ মে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে তাকে আটক করা হয়েছিল। স্থানীয়দের ভাষ্য, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার হলেও আইনি প্রক্রিয়ার পর অনেকেই আবার এলাকায় ফিরে এসে আগের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন।
ত্রিমোহনী এলাকায় মাদক বিক্রির ধরনও বদলেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ক্রেতারা মোবাইল ফোনে মাদকের অর্ডার করলেই নির্দিষ্ট ঠিকানায় তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ভ্যান কিংবা বাইসাইকেলে করে ডেলিভারি দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য। এতে মাদকসেবীদের নির্দিষ্ট কোনো বিক্রয়স্থলে গিয়ে মাদক সংগ্রহ করতে হচ্ছে না। সহজে এবং বহনের ঝুঁকি ছাড়াই গাঁজা, ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য পাওয়ায় ক্রেতার সংখ্যাও বাড়ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ত্রিমোহনী গ্রাম ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন মাদক কারবারি বিভিন্ন অলিগলিতে মাদকের পয়েন্ট পরিচালনা করছে। এসব পয়েন্টে বিভিন্ন সময়ে মাদকসেবীদের আনাগোনা দেখা যায় বলে স্থানীয়দের দাবি। মাদক কারবারিদের সঙ্গে মাদকসেবীদের মধ্যে কখনো কখনো টাকা-পয়সা কিংবা মাদক সরবরাহ নিয়ে বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। তবে এসব ঘটনায় স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মুখ খুলতে চান না। ফলে অনেক মাদক কারবারির পরিচয় ও কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে এলেও তাদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ কিশোর গ্যাং ও একটি মাদক সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্রের তৎপরতায় এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। মাদকের সহজলভ্যতার কারণে উঠতি বয়সী যুবক থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশও মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। মাদককে কেন্দ্র করে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও চক্রটির কিছু সদস্য জড়িয়ে পড়ছে।
ত্রিমোহনী গ্রামের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো শার্শা উপজেলা কার্যালয় ও শার্শা থানা থেকে মাত্র প্রায় এক কিলোমিটার দূরে হলেও এলাকায় মাদকের বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করে কয়েকজনকে আটক করা হলেও অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে মাদক কারবারিরা। ফলে মাদকের মূল নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে ধারাবাহিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এ সমস্যা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
যশোর জেলা কৃষক দলের সদস্য আলমগীর হোসেন বলেন, মাদক কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা দলের বিষয় নয় এটি সমাজ ও তরুণ প্রজন্ম ধ্বংসের অন্যতম কারণ। ত্রিমোহনীসহ পুরো এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে। মাদক কারবারের সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক, সে যে দলেরই হোক কিংবা যত প্রভাবশালীই হোক, তাকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। মাদকের কারণে এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, যুবসমাজ বিপথগামী হচ্ছে। তাই মাদক নির্মূলে প্রশাসনের কঠোর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপের পাশাপাশি স্থানীয়দেরও সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে।
শার্শা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামিনুল হক বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান নিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। মাদক কারবারি কিংবা মাদক সরবরাহের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ত্রিমোহনী এলাকায় মাদক কারবারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাদক নির্মূলে পুলিশি তৎপরতার পাশাপাশি স্থানীয়দের সহযোগিতা ও তথ্য প্রদানও গুরুত্বপূর্ণ।
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

ছুটি শেষে বেনাপোল স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি শুরু
বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি শেষেবিস্তারিত পড়ুন

বেনাপোলে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ যুবক আটক
যশোরের বেনাপোলে মুরগিবাহী একটি ভ্যান থেকে বিদেশি পিস্তল, ম্যাগজিন ও দুই রাউন্ডবিস্তারিত পড়ুন

মুরগিবাহী ভ্যানের ছাউনিতে মিললো পিস্তল-গুলি, আটক ভ্যানচালক
যশোরের বেনাপোলে মুরগিবাহী একটি ইঞ্জিনচালিত ভ্যানের চালকের আসনের ওপর স্থাপিত ছাউনির ভেতরবিস্তারিত পড়ুন


