নতুন স্বপ্ন, নতুন পথচলা বি.জে.এস.এম মডেল কলেজে একাদশ শ্রেণির নবীনবরণ


“স্বপ্ন যেখানে সার্থক”—এই প্রত্যয়কে সামনে রেখে উৎসবমুখর পরিবেশে নরসিংদীর মনোহরদীতে বি.জে.এস.এম মডেল কলেজে অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০২৬–২০২৭ শিক্ষাবর্ষের একাদশ শ্রেণির নবীনবরণ অনুষ্ঠান।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টায় কলেজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে নবীন শিক্ষার্থীদের ফুলেল শুভেচ্ছা ও উষ্ণ অভ্যর্থনার পাশাপাশি নতুন শিক্ষাজীবনকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম। প্রধান অতিথি ছিলেন মনোহরদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহামুদুল হাসান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বি.জে.এস.এম মডেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মঞ্জিল মোল্লা।
এ সময় কলেজের শিক্ষকবৃন্দ, নবীন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
বড় স্বপ্ন দেখার আহ্বান অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলামের
প্রধান আলোচক অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম নবীন শিক্ষার্থীদের বড় স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে এখন থেকেই পরিকল্পিতভাবে নিজেকে প্রস্তুত করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে শিক্ষার্থীদের সামনে নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলার অসংখ্য সুযোগ রয়েছে। তবে এসব সুযোগ কাজে লাগাতে হলে নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে এবং সে অনুযায়ী জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে।
তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবই ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনায় সীমাবদ্ধ না থেকে ইংরেজি ভাষা, প্রযুক্তি, যোগাযোগ দক্ষতা, গবেষণা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে নিজেদের সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন।
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, “তোমরা এখন থেকেই বড় স্বপ্ন দেখবে। তোমাদের লক্ষ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়; নিজেকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে দেশ ও বিশ্বের যেকোনো জায়গায় তোমরা নিজের যোগ্যতা দিয়ে জায়গা করে নিতে পারো।”
বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও স্কলারশিপের সুযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভালো ফলাফলের পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা, একাডেমিক প্রস্তুতি, গবেষণামুখী মানসিকতা, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং নিজের যোগ্যতা যথাযথভাবে উপস্থাপনের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি নেলসন ম্যান্ডেলার জীবন ও সংগ্রামের উদাহরণ তুলে ধরে প্রতিকূলতার মধ্যেও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হওয়ার আহ্বান জানান।
“একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় সাফল্য তাঁর শিক্ষার্থীর সাফল্য”
অনুষ্ঠানের সভাপতি ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যক্ষ মঞ্জিল মোল্লা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু অবকাঠামো কিংবা পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন শিক্ষার্থীর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা এবং তাকে যোগ্য, নৈতিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম বড় অর্জন।
তিনি বলেন, “একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো তাঁর শিক্ষার্থীর সাফল্য।”
অধ্যক্ষ মঞ্জিল মোল্লা আরও বলেন, একজন শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করে উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে গেলে, কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হলে এবং সমাজে একজন ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করলে সেই সাফল্যের সঙ্গে তার পরিবার, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্জনও যুক্ত হয়।
মাদক ও ক্ষতিকর আসক্তি থেকে দূরে থাকার আহ্বান
প্রধান অতিথি মনোহরদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহামুদুল হাসান নবীন শিক্ষার্থীদের মাদক ও বিভিন্ন ক্ষতিকর আসক্তি থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, একটি সুন্দর, নিরাপদ ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে তরুণ প্রজন্মকে দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে হবে। মাদকাসক্তির প্রভাব শুধু ব্যক্তিজীবনে নয়, পরিবার, শিক্ষা, কর্মজীবন ও সমাজেও পড়ে।
তিনি শিক্ষার্থীদের ভালো বন্ধু নির্বাচন, নিয়মিত পড়াশোনা, সুস্থ জীবনযাপন এবং সময়ের সঠিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতন থাকার পরামর্শ দেন।
“গ্রামের শিক্ষার্থীও দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারে”
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইউএনও মাহামুদুল হাসান বলেন, তিনিও গ্রামের ছেলে। তাই গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিজেদের সুযোগ কম—এমন ধারণা থাকা উচিত নয়।
তিনি বলেন, সঠিক প্রস্তুতি, কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা থাকলে গ্রামের একজন শিক্ষার্থীও দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে।
একাদশ শ্রেণি থেকেই উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে পরিকল্পিত প্রস্তুতি শুরু করার জন্য তিনি নবীনদের পরামর্শ দেন।
খরগোশ-কচ্ছপের গল্পে সাফল্যের পাঠ দিলেন প্রভাষক তৌফিক সুলতান
নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন কলেজের প্রভাষক তৌফিক সুলতান স্যার। প্রচলিত খরগোশ-কচ্ছপের গল্পকে শিক্ষাজীবনের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে তিনি শিক্ষার্থীদের সামনে সাফল্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, খরগোশ নিজের গতি ও সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে কচ্ছপকে অবহেলা করেছিল। অন্যদিকে কচ্ছপ ধীরগতির হলেও থেমে যায়নি। ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার কারণেই শেষ পর্যন্ত সে সফল হয়।
শিক্ষাজীবনের সঙ্গে গল্পটির তুলনা করে তৌফিক সুলতান বলেন, মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করার পর কোনো শিক্ষার্থী যদি আত্মতুষ্ট হয়ে নিয়মিত পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে সে খরগোশের মতো পিছিয়ে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, “মাধ্যমিকে ভালো ফলাফল শেষ নয়; এটি পরবর্তী সাফল্যের ভিত্তি। ভালো ফল করার পর আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে।”
মেধার পাশাপাশি দরকার সঠিক ব্যবহার ও কৌশল
তৌফিক সুলতান বলেন, মেধা থাকা যথেষ্ট নয়; মেধাকে সঠিক সময়ে, সঠিক জায়গায় ও সঠিক পদ্ধতিতে কাজে লাগাতে জানতে হবে।
তার মতে, একজন শিক্ষার্থীর ভালো ফল করার সক্ষমতা থাকলেও পরিকল্পনার অভাব, সময়ের অপচয়, অমনোযোগ কিংবা ভুল পদ্ধতির কারণে সেই সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত ফলাফলে রূপ নিতে পারে না।
তিনি বলেন, “প্রথম সাফল্যে আত্মতুষ্ট হয়ো না, ব্যর্থতায় হতাশ হয়ো না এবং পরিশ্রম করলেও ভুল পথে থেকো না। লক্ষ্য ঠিক করো, পথ ঠিক করো, নিয়মিত চেষ্টা করো—সাফল্যের সম্ভাবনা তখন অনেক বেড়ে যাবে।”
নবীনদের জন্য তিনি নিয়মিত পড়াশোনা, সময় ব্যবস্থাপনা, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ, দুর্বল বিষয় চিহ্নিত করে কাজ করা, অনুশীলন ও পুনরাবৃত্তি, শিক্ষকদের পরামর্শ গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেন।
একই সঙ্গে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও মানসিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
প্রযুক্তিকে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যম করার আহ্বান
বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের জীবনে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবের বিষয়টিও তুলে ধরেন তৌফিক সুলতান।
তিনি বলেন, প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়; এর ব্যবহার নির্ভর করে ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য ও অভ্যাসের ওপর। ইন্টারনেট ব্যবহার করে শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের শিক্ষা, ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা ও ক্যারিয়ার প্রস্তুতির সুযোগ নিতে পারে।
তবে অতিরিক্ত বিনোদন, অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় ব্যয় শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় নষ্ট করতে পারে। তাই প্রযুক্তিকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম না বানিয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের কাজে ব্যবহারের আহ্বান জানান তিনি।
ভালো ফলাফলের পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়ার আহ্বান
নবীনবরণ অনুষ্ঠানে বক্তাদের বক্তব্যে শিক্ষার একটি মৌলিক উদ্দেশ্য বিশেষভাবে উঠে আসে—শিক্ষা শুধু ভালো ফলাফল অর্জনের মাধ্যম নয়; একজন শিক্ষার্থীকে জ্ঞানী, দক্ষ, নৈতিক, মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও এর অন্যতম লক্ষ্য।
বক্তারা বলেন, একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ সাফল্য শুধু সার্টিফিকেট বা ফলাফলের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। সততা, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা, নৈতিকতা, সামাজিক আচরণ এবং অন্যের প্রতি সম্মানও একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নতুন শিক্ষাবর্ষে নতুন প্রত্যয়
২০২৬–২০২৭ শিক্ষাবর্ষের একাদশ শ্রেণির নবীনবরণ অনুষ্ঠানটি নবীন শিক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিক স্বাগত জানানোর পাশাপাশি তাদের নতুন শিক্ষাজীবনের লক্ষ্য, দায়িত্ব, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে ওঠে।
অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলামের বড় স্বপ্ন ও উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির বার্তা, ইউএনও মাহামুদুল হাসানের মাদকমুক্ত ও সচেতন সমাজ গঠনের আহ্বান, অধ্যক্ষ মঞ্জিল মোল্লার শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সাফল্যের সম্পর্ক এবং প্রভাষক তৌফিক সুলতানের খরগোশ-কচ্ছপের গল্পের মাধ্যমে পরিকল্পিত পরিশ্রমের শিক্ষা—সব মিলিয়ে নবীনদের সামনে উঠে আসে একটি সমন্বিত দিকনির্দেশনা।
স্বপ্ন হবে বড়, লক্ষ্য হবে স্পষ্ট, মেধার ব্যবহার হবে সঠিক, সময়ের মূল্য দিতে হবে এবং সাফল্যের জন্য থাকতে হবে ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত প্রচেষ্টা—নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে বি.জে.এস.এম মডেল কলেজের নবীন শিক্ষার্থীদের জন্য নবীনবরণ অনুষ্ঠান থেকে উঠে আসে এই প্রত্যয়ই।
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

চৌগাছায় পুকুরের পানিতে ডুবে মামা-ভাগনে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু
যশোরের চৌগাছায় পুকুরের পানিতে ডুবে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। ICT কোচিংবিস্তারিত পড়ুন

সাতক্ষীরায় টিকটকের পরিচয়ে পরকীয়ায় ঘর ছারলেন এক সন্তানের জননী!
সাতক্ষীরার ভোমরা ইউনিয়নের নবাতকাটি গ্রামে এক গৃহবধূকে টিকটকের মাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরেবিস্তারিত পড়ুন

দখল-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সরকারের জন্য অশনিসংকেত: টিআইবি
দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতেবিস্তারিত পড়ুন


