সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় করা হোক


।।মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল।।
সাতক্ষীরায় একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই জনপদ শিক্ষা, কৃষি, মৎস্য, শিল্প, প্রযুক্তি ও পরিবেশের দিক থেকে অপার সম্ভাবনাময়। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে একটি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি এর নামও হতে পারে একটি ঐতিহাসিক পরিচয় ও প্রেরণার উৎস। সেই বিবেচনায় প্রস্তাবিত সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ‘খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।
খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা ছিলেন সাতক্ষীরার কৃতী সন্তান এবং উপমহাদেশের শিক্ষা ও সমাজসংস্কারের ইতিহাসে স্মরণীয় এক ব্যক্তিত্ব। তিনি এমন এক সময়ে শিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন, যখন সমাজের একটি বড় অংশ আধুনিক শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে ছিল। শিক্ষা প্রশাসনে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি শিক্ষার বিস্তার, বিশেষ করে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তাঁর শিক্ষা-দর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল জ্ঞানার্জনের সঙ্গে নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের সমন্বয়। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল শুধু জীবিকা অর্জনের মাধ্যম নয়; শিক্ষা মানুষের চরিত্র গঠন, সমাজের উন্নয়ন এবং মানবকল্যাণের পথ। আজকের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে এই দর্শনের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক তৈরি করাও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম দায়িত্ব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লার শিক্ষা-অবদানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় তাঁর সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রকাশনায়ও বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্নে তিনি দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন এবং বিশেষ কমিটির সদস্য হিসেবে বিরোধীদের যুক্তির জবাব দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া একদিনে সম্পন্ন হয়নি। ১৯১৪ সালে গঠিত হর্নেল কমিটির সঙ্গে খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার খসড়া বিল পর্যালোচনার জন্য ১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের বিশেষ কমিটি গঠিত হলে তিনি সেই নয় সদস্যের কমিটির সদস্য হন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। কমিটির প্রতিবেদনের সঙ্গে তাঁর একটি পৃথক ‘নোট অব ডিসেন্ট’ও যুক্ত হয়, যেখানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। তাঁর দেওয়া বেশ কিছু প্রস্তাব পরবর্তী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯২০-এ প্রতিফলিত হয়েছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণা ও প্রকাশনায় উল্লেখ রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ইতিহাস অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ অনুমোদিত হয় এবং ১৯২১ সালের ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।
অর্থাৎ খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লার অবদান কেবল শিক্ষা প্রশাসনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; একটি বৃহৎ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াতেও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কর্তৃপক্ষও তাঁর এই অবদানকে স্মরণ করে বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য এবং তাঁর অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা বিবেচনায় সাতক্ষীরায় তাঁর নামে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণের প্রস্তাব নতুন তাৎপর্য পেতে পারে। একদিকে এটি হবে সাতক্ষীরার একজন কৃতী শিক্ষাবিদের প্রতি সম্মান, অন্যদিকে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার সঙ্গে তাঁর শিক্ষা-আদর্শের একটি প্রতীকী সংযোগ।
সাতক্ষীরার সঙ্গে খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লার ঐতিহাসিক সম্পর্ক তাঁর নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলতে পারে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম যখন কোনো কৃতী ব্যক্তির জীবন ও কর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সেই নাম শিক্ষার্থীদের কাছে ইতিহাসের একটি জীবন্ত পাঠ হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী তাঁর জীবন, শিক্ষা-চিন্তা, সমাজসংস্কার এবং উচ্চশিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা সম্পর্কে জানতে পারবে। এতে স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতিও নতুন প্রজন্মের আগ্রহ সৃষ্টি হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শ্রেণিকক্ষ, পরীক্ষাগার কিংবা সনদ প্রদানের প্রতিষ্ঠান নয়। এটি একটি অঞ্চলের জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও সামাজিক নেতৃত্বের কেন্দ্র। সাতক্ষীরার বাস্তবতা বিবেচনায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা, কৃষি, মৎস্য, সুন্দরবন, পরিবেশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সীমান্ত অর্থনীতিসহ স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। আর সেই জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লার নাম যুক্ত হলে তা শিক্ষা ও মানবকল্যাণের ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির একটি প্রতীকী সংযোগ তৈরি করবে।
অবশ্যই নামকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, সরকারি নীতিমালা, ঐতিহাসিক তথ্য এবং সংশ্লিষ্টদের মতামত বিবেচনা করা প্রয়োজন। এটি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আবেগের বিষয় হিসেবে নয়, বরং সাতক্ষীরার শিক্ষা-ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে একটি জনআলোচনার বিষয় হিসেবে দেখা উচিত।
প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র’, বার্ষিক স্মারক বক্তৃতা কিংবা তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। এতে নামকরণ শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; তাঁর শিক্ষা-দর্শন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার অংশ হয়ে উঠবে।
সাতক্ষীরার মাটিতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উচ্চশিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সঙ্গে যদি এই জনপদের এক কৃতী শিক্ষাবিদের নাম যুক্ত হয়, তাহলে তা স্থানীয় ইতিহাসের প্রতিও সম্মান প্রদর্শন হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তৈরি হবে একটি অনুপ্রেরণার ঠিকানা। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মতো ঐতিহাসিক উচ্চশিক্ষা উদ্যোগে তাঁর অবদান স্মরণে রাখলে প্রস্তাবিত নামকরণ আরও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।
তাই ‘সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’-এর নাম ‘খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ করার প্রস্তাবটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, শিক্ষাবিদ, গবেষক, নাগরিক সমাজ ও সাতক্ষীরার মানুষের গঠনমূলক আলোচনায় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। এটি শুধু একটি নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব নয়; বরং সাতক্ষীরার শিক্ষা-ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তি-চর্চার সঙ্গে যুক্ত করার একটি সম্ভাব্য উদ্যোগ।
মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল
সাংবাদিক ও উন্নয়ন ও মানবাধিকারকর্মী
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

সাতক্ষীরার সেই এমপি গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলাম (জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত) এরবিস্তারিত পড়ুন

সাতক্ষীরায় জেলা যুবদলের কমিটি ঘোষণা দেওয়ায় আনন্দ মিছিল
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল সাতক্ষীরা জেলা যুবদলের ৫ সদস্য বিশিষ্ট আংশিক নবগঠিত কমিটিবিস্তারিত পড়ুন

বিটিভির সংগীতশিল্পী হিসেবে ‘উচ্চ’ শ্রেণির স্বীকৃতি পেলেন সাতক্ষীরার আবু আফ্ফান রোজবাবু
বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) আধুনিক গানের সংগীতশিল্পী হিসেবে ‘উচ্চ’ শ্রেণির সম্মানের স্বীকৃতি পেয়েছেনবিস্তারিত পড়ুন


