সাংবাদিকতার একাল-সেকাল: প্রযুক্তির অগ্রগতি, নাকি পেশার অবক্ষয়?


সাংবাদিকতার একাল-সেকাল: প্রযুক্তির অগ্রগতি, নাকি পেশার অবক্ষয়?
মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল
একসময় সাংবাদিকতা ছিল একটি মহান, দায়িত্বশীল ও সম্মানজনক পেশা। সাংবাদিকের পরিচয় ছিল সমাজের বিবেক, সত্যের অনুসন্ধানী এবং মানুষের আস্থার প্রতীক। তখন সাংবাদিকের সংখ্যা ছিল সীমিত, কিন্তু তাদের গ্রহণযোগ্যতা, মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল অসীম। সমাজে সাংবাদিকদের প্রতি ছিল বিশেষ সম্মান, কারণ তারা সত্য প্রকাশে নির্ভীক এবং নীতির প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন।
সাংবাদিকতার সেই সময় ছিল কঠোর পরিশ্রমের যুগ। সংবাদ সংগ্রহ করে হাতে লিখে তা টেলিগ্রাম, ডাকযোগে বা পোস্ট অফিসের মাধ্যমে পাঠাতে হতো। একটি সংবাদ প্রকাশের পেছনে ছিল ধৈর্য, যাচাই-বাছাই এবং নিরলস শ্রম। পরে প্রযুক্তির বিকাশে কম্পিউটার ও ল্যাপটপের ব্যবহার শুরু হয়। সংবাদ পাঠানো সহজ হয়, গতি বাড়ে এবং সংবাদ পরিবেশনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
বর্তমানে মোবাইল সাংবাদিকতা (Mobile Journalism) সাংবাদিকতায় এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। একটি স্মার্টফোন দিয়েই এখন ছবি, ভিডিও, লাইভ সম্প্রচার, সম্পাদনা ও সংবাদ প্রকাশ—সবকিছু করা সম্ভব। মুহূর্তের মধ্যে একটি সংবাদ দেশ-বিদেশে পৌঁছে যাচ্ছে। প্রযুক্তির এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে সাংবাদিকতার পরিধি বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—প্রযুক্তির এই বিস্তারের সঙ্গে কি সাংবাদিকতার মান ও মর্যাদাও সমানভাবে বেড়েছে?
দুঃখজনক হলেও সত্য, সাংবাদিকতার বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে পেশাটির মর্যাদা অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আজ “পকেটে পকেটে মোবাইল, পকেটে পকেটে প্রেস কার্ড, ঘরে ঘরে সাংবাদিক”—এমন একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। সাংবাদিক পরিচয় এখন অনেক ক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও নৈতিকতার পরিবর্তে একটি পরিচয়পত্র বা সামাজিক প্রভাবের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফলে প্রকৃত সাংবাদিক ও অপেশাদার ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই ছাড়া সংবাদ প্রকাশ, ভুয়া তথ্য প্রচার, ব্ল্যাকমেইল, চাঁদাবাজি, ব্যক্তিস্বার্থে সাংবাদিকতার অপব্যবহার এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ বাড়ছে। এসব কারণে জনগণের একাংশের কাছে সাংবাদিকতার প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে, যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
অবশ্যই এ কথা মনে রাখতে হবে, সব সাংবাদিক এক নন। এখনও অসংখ্য পেশাদার, সৎ ও সাহসী সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য প্রকাশে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের নিষ্ঠা ও ত্যাগের কারণেই সাংবাদিকতার মূল চেতনা এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তাই কয়েকজনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো সাংবাদিক সমাজকে দোষারোপ করা ন্যায়সংগত নয়।
সাংবাদিকতার মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন পেশাগত নৈতিকতা, জবাবদিহিতা এবং দক্ষতা বৃদ্ধি। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের উচিত যোগ্য ও প্রশিক্ষিত ব্যক্তিদের সাংবাদিকতায় সুযোগ দেওয়া। প্রেস কার্ড প্রদানে কঠোর নীতিমালা প্রয়োগ, ভুয়া সাংবাদিকতা প্রতিরোধ, তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোর কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি সাংবাদিকদেরও মনে রাখতে হবে—সাংবাদিকতা কোনো ক্ষমতার পরিচয় নয়; এটি জনস্বার্থে সত্য তুলে ধরার একটি মহান দায়িত্ব।
প্রযুক্তি সাংবাদিকতার শত্রু নয়; বরং এটি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু সেই হাতিয়ারের ব্যবহার যদি নৈতিকতা, সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে না হয়, তবে প্রযুক্তির উন্নতি সাংবাদিকতার প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কোন পথ বেছে নিই—সত্য, নীতি ও জনকল্যাণের পথ, নাকি ব্যক্তিস্বার্থ, অনিয়ম ও অপসাংবাদিকতার পথ। সময়ের দাবি, সাংবাদিকতার হারানো মর্যাদা ফিরিয়ে এনে আবারও এটিকে মানুষের আস্থা ও গণতন্ত্রের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

লেখক:
মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল
সংবাদকর্মী, মানবাধিকার ও উন্নয়নকর্মী।
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

কিডনী রোগে আক্রান্ত সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম আশা অসুস্থ্য, সকলের দোয়া কামনা
জেলা টিভি ক্যামেরা জার্নালিস্ট এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি, জাতীয় দৈনিক প্রগতির সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধিবিস্তারিত পড়ুন

সাতক্ষীরার ব্রহ্মরাজপুরে শিক্ষার্থীদের মাঝে ফলজ ও বনজ গাছের চারা বিতরণ
সাতক্ষীরার ব্রহ্মরাজপুরে বালাইনাশক কোম্পানি ইনতেফা পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের মাঝে ফলজ ও বনজবিস্তারিত পড়ুন

কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সাতক্ষীরায় পার্টনার কংগ্রেস
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপবিস্তারিত পড়ুন


