আদর্শের আলোয় এক সন্ধ্যা: সাতক্ষীরায় যুবশক্তির প্রেরণা স্বামী বিবেকানন্দ


“বিবাদ নয়, সহায়তা; বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ; মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি”—এই অমরবাণীকে সামনে রেখে সাতক্ষীরায় নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে যুবনায়ক স্বামী বিবেকানন্দের ১৬৩তম জন্মবার্ষিকী।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী মায়েরবাড়িতে বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদের উদ্যোগে আলোচনা সভা, শীতবস্ত্র বিতরণ ও মানবসেবামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
এর আগে রামকৃষ্ণ মন্দির ও ধ্যানঘরে বিশেষ প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ও দর্শনভিত্তিক সংগীত পরিবেশন করেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তৃপ্তিমোহন মল্লিক।
বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক তপন কুমার শীলের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক বিশ্বরূপ চন্দ্র ঘোষের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরা জেলা মন্দির সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সোমনাথ ব্যানার্জী।
সাতক্ষীরা জেলা মন্দির সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সোমনাথ ব্যানার্জী বলেন, স্বামী বিবেকানন্দ ধর্মকে কেবল উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি মানবসেবাকেই ঈশ্বরসেবার সমান মর্যাদা দিয়েছেন। আজ সমাজে বিভাজন ও সহিংসতার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা মোকাবিলায় তাঁর সহায়তা ও সমন্বয়ের দর্শন আমাদের জন্য পথনির্দেশক।
অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তার বক্তব্যে সারদা সংঘ সাতক্ষীরার সভাপতি শ্রীমতি কল্যাণী রায় বলেন, মাত্র ৩৯ বছরের জীবনে স্বামী বিবেকানন্দ যে দর্শন রেখে গেছেন, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে। তিনি তরুণ সমাজকে আত্মবিশ্বাসী, নৈতিক ও মানবিক শক্তিতে বলীয়ান করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
সংগঠনের উপদেষ্টা অধ্যক্ষ পবিত্র মোহন দাশ তাঁর বক্তব্যে বলেন, “এক সময়ের তেজস্বী ও কর্মদক্ষ নরেন্দ্রনাথ দত্ত শ্রী রামকৃষ্ণের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে স্বামী বিবেকানন্দ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। অনাহার ও স্বল্পাহারকে সঙ্গী করে তিনি ভারতবর্ষ পায়ে হেঁটে ঘুরেছেন, মানুষের দুঃখ-কষ্ট প্রত্যক্ষ করেছেন।”
বিশেষ অতিথি’র বক্তব্যে সাংবাদিক শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন বলেন, স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন এমন এক যুগপুরুষ, যিনি যুবসমাজকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে আত্মমর্যাদা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর ‘ওঠো, জাগো’ আহ্বান আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
অধ্যক্ষ নির্মল কুমার দাশ বলেন, “স্বামী বিবেকানন্দ তরুণদের শারীরিক ও মানসিক শক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেছিলেন—‘বি অ্যান্ড মেক’, অর্থাৎ নিজেকে গঠন করো এবং অন্যকে গঠনে সহায়তা করো। এই দর্শনেই একটি শক্তিশালী সমাজ গড়ে ওঠে।”
শ্রীমতি স্নিগ্ধা নাথ বলেন, “ঈশ্বরপ্রেম, দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম—এই তিনের সমন্বয়েই স্বামী বিবেকানন্দের দর্শন পূর্ণতা পেয়েছে। তিনি ধর্মের নামে বিভেদ নয়, ভালোবাসার সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।”
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিত্যানন্দ সরকার বলেন, স্বামী বিবেকানন্দ শুধু একজন ধর্মগুরু নন, তিনি ছিলেন মানবমুক্তির দিশারি। তাঁর দর্শনে রাজনীতি, সমাজ ও মানবসেবা—সবকিছুরই নৈতিক ভিত্তি রয়েছে। আজকের সমাজে বিভেদ ও হিংসার রাজনীতি পরিহার করে সহমর্মিতা, সহায়তা ও শান্তির পথে এগিয়ে যেতে স্বামীজীর আদর্শ আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়।
বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বরূপ চন্দ্র ঘোষ বলেন,স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ কেবল আলোচনা সভায় সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নয়, তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগের মধ্যেই এর সার্থকতা। শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্নসেবা ও মানবকল্যাণমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা স্বামীজীর মানবপ্রেম ও সহায়তার দর্শন বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি।
আলোচনা সভা শেষে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শতাধিক শীতার্ত ও অসহায় মানুষের মাঝে শীত নিবারণের নিমিত্তে সেবার পাশে দাঁড়ান সাতক্ষীরার বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদ এর জেলা শাখার সেবাকর্মীরা। মানবসেবার এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন আয়োজকরা।
প্রদীপের শিখা নিভে গেলেও নিভে যায়নি আদর্শের আলো। সাতক্ষীরার মায়েরবাড়ির প্রাঙ্গণে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ, বিতরণ করা প্রতিটি শীতবস্ত্র যেন স্মরণ করিয়ে দিল—স্বামী বিবেকানন্দ আজও সময়ের কণ্ঠস্বর। সহায়তা, সমন্বয় ও মানবপ্রেমের যে পথ তিনি দেখিয়ে গেছেন, সেই পথেই এগিয়ে চলার প্রত্যয় নিয়েই শেষ হয় দিনের আয়োজন; আর হৃদয়ের গভীরে জেগে থাকে একটাই আহ্বান—ওঠো, জাগো, মানবতার পাশে দাঁড়াও।
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

সাতক্ষীরায় ‘বর্ণালী আর্ট’-এর ৫০ বছর পূর্তি: সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনে প্রস্তুতি সভা
সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী ও সুনামধন্য চিত্রাঙ্কন প্রতিষ্ঠান ‘বর্ণালী আর্ট’-এর ৫০ বছর পূর্তি তথাবিস্তারিত পড়ুন

সাতক্ষীরায় পেশাজীবি গাড়ি চালক/শ্রমিকদের দক্ষতা ও শব্দদূষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সাতক্ষীরা সার্কেলের উদ্যোগে পেশাজীবি গাড়ি চালক/শ্রমিকদের দক্ষতাবিস্তারিত পড়ুন

কালিগঞ্জ সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশি আহত
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার বসস্তপুর সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে দুইবিস্তারিত পড়ুন

