বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন
তারেক রহমানের প্রতি উষ্ণতা দেখাতে ভারতের একযুগ লেগে গেল যে কারণে


বাংলাদেশে বিগত চারটি নির্বাচনে ফল প্রকাশের পরই প্রথম যে বিশ্বনেতা বিজয়ী দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন জানিয়ে এসেছেন, তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
মনমোহন সিং বা নরেন্দ্র মোদি, যিনিই দিল্লির ক্ষমতায় থাকুন– এ ‘নিয়মে’ কখনো ব্যতিক্রম হয়নি।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন বলছে, শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকালেও ঠিক সেই রেওয়াজেরই পুনরাবৃত্তি ঘটল, যদিও বাংলাদেশে ভাবী প্রধানমন্ত্রীর নাম এবারে বদলে গেছে এবং ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন হওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এই ভোটে লড়াইয়ের সুযোগ পায়নি।
এই প্রেক্ষাপটেই শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) ভারতে সকাল ৯টা বাজার ঠিক পর পরই প্রধানমন্ত্রী মোদি তার এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করে ‘সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপির নির্ণায়ক জয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য’ তারেক রহমানকে ‘উষ্ণ অভিনন্দন’ জানালেন।
তিনি আরও লিখলেন, ‘এই জয় দেখিয়ে দিল বাংলাদেশের মানুষ আপনার নেতৃত্বে আস্থা রেখেছে।’
আধা ঘণ্টা পর তিনি একই জিনিস পোস্ট করলেন বাংলা ভাষাতেও, যাতে বাংলাদেশেও আরও বেশি মানুষের কাছে সে বার্তা পৌঁছে যেতে পারে।
সেখানেই শেষ নয়, তিনি এরপর সরাসরি ফোনও করেন তারেক রহমানকে।
যে তারেক রহমানের প্রতি ভারত অতীতে রীতিমতো শীতল মনোভাব দেখিয়েছে এবং তার সৌজন্যমূলক পদক্ষেপেও পাল্টা সাড়া দেয়নি, সেই একই রাজনীতিবিদের প্রতি এ আচরণকে রীতিমতো ‘ডিপ্লোম্যাটিক ইউটার্ন’ বলেই বর্ণনা করা যায়।
ভারতে পর্যবেক্ষকরা সবাই এক বাক্যে মেনে নিচ্ছেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী বিএনপি সরকারই ভারতের জন্য এই মুহূর্তে সেরা বাজি, সেই উপলব্ধি থেকেই ভারতের এই পদক্ষেপ।
অতীতে বিএনপি সরকারগুলোর আমলে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কে যতই ওঠাপড়া থাকুক, ভারত যে আপাতত সেসব পুরোনো বিষয় মনে না রেখে সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে আগ্রহী– এখন প্রধানমন্ত্রী মোদির বার্তায় সে কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে।
তবে বাংলাদেশে নতুন সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত যে বিভিন্ন ইস্যু ধরে ধরে আলাদা অবস্থান নিতে চায়, দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত বৃহস্পতিবার সেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন।
ভারতের শাসক দল বিজেপির পক্ষ থেকে যেমন বলা হচ্ছে, ঢাকায় যে দলের সরকারই ক্ষমতায় আসুক, সে দেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন-অত্যাচার বন্ধ না হলে সেই সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুতেই সহজ হতে পারে না।
তবে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের অবসানে একটি নতুন নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের আগমনকে ভারত যে স্বাগত জানাচ্ছে ও তাদের প্রতি ইতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
মোদিকে তারেক রহমানের প্রীতি উপহার, অতঃপর…
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি যখন প্রথমবার নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা নিয়ে ভারতের ক্ষমতায় এলো, তারেক রহমান তখন লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।
কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক যেহেতু ছিল ঐতিহাসিক, সেই কংগ্রেসের এক দশকব্যাপী শাসনের অবসানের পর বিজেপি যখন ভারতের ক্ষমতায় আসে, তখন বিজেপির সঙ্গে বাংলাদেশের বিএনপির একটা স্বাভাবিক সহজ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে বলে সে সময় তারেক রহমান ধারণা করেছিলেন। তারেক রহমানের ঘনিষ্ট একাধিক সূত্র তখন তার এমন ধারণার কথা জানিয়েছিল।
বিজেপির নতুন সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টাতেই প্রধানমন্ত্রী মোদিকে তখন তারেক রহমানের পক্ষ থেকে একটি প্রীতি উপহারও পাঠানো হয়েছিল।
দিল্লিতে সেটি পৌঁছে দিয়েছিলেন বিজেপির বৈদেশিক বিভাগের তখনকার নেতা বিজয় জলি।
পাঠানো হয়েছিল আরও নানা ধরনের ‘ফিলার’ … কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক, ভারত কিন্তু তখন তার পাল্টা সৌজন্য দেখায়নি। কিংবা দেখাতে পারেনি।
ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী বলেছেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা বিএনপির সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ স্থাপনের ব্যাপারে খুব স্পর্শকাতর ছিলেন। তার সেনসিটিভিটি-ও একটা খুব বড় কারণ যে এই যোগাযোগটা সেভাবে হয়ে ওঠেনি।
তবে প্রকাশ্যে না হলেও বিএনপির নানা স্তরের নেতাদের সঙ্গে ‘ট্র্যাক টু’ স্তরে বা পর্দার আড়ালে বিভিন্ন থিংকট্যাংক বা অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিবিদ, নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মারফত একটা যোগাযোগ ভারত বরাবর রাখতে চেষ্টা করে গেছে।
পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, সে সময় আমি নিজেই এ ধরনের একাধিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম। দিল্লিতে তো বটেই, এমনকি ব্যাংককেও।
হাসিনার পতনের পরই তারেক রহমানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির বদল
২০২৪-এর ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ক্ষমতার নাটকীয় পালাবদলের পর সার্বিকভাবে বিএনপির প্রতি এবং অবশ্যই তারেক রহমানের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটা আমূল পরিবর্তন আসে।
বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপিই যে ভারতের অবধারিত পছন্দ, সেই উপলব্ধিই দিল্লির মনোভাবে এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ।
২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের তখনকার সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার যখন তারেক রহমানের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালানোর পর তাকে লন্ডন যেতে বাধ্য করে, তখন ঢাকায় ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী।
তিনি বলেন, বিএনপি তাদের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বলেই বর্ণনা করে থাকে – তবে তারেক রহমান তার সাম্প্রতিক ভাষণগুলোতে ভারতকে কখনোই সরাসরি কড়া ভাষায় আক্রমণ করেননি, সেটাকেও দিল্লি ইতিবাচক বলেই মনে করছে।
‘ভাবী প্রধানমন্ত্রী’ তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানাতে এবং তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আস্থা রেখেছে, এ কথা উচ্চারণ করতে নরেন্দ্র মোদি যে এতটুকুও সময় নেননি– তার পেছনে বড় কারণ এগুলোই।
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের ৫৮ বিধায়কের বিদ্রোহ, দল থেকে ‘মাইনাস’ মমতা ব্যানার্জি
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের এক মাসের মাথায় তৃণমূল কংগ্রেসে বড় ধরনের ভাঙনেরবিস্তারিত পড়ুন

তৃণমূলের সব সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দিলেন মমতা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। দলীয় সংকটবিস্তারিত পড়ুন

মমতার তৃণমূলে ভাঙন, বহিষ্কৃত ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা বানালেন ৫৮ বিদ্রোহী বিধায়ক
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ক্ষমতা হারানোর পর এবার ভাঙনের মুখে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস।বিস্তারিত পড়ুন

