ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত
পাল্টাপাল্টি হুমকিতে ঝুঁকিতে যুদ্ধবিরতি, বিশ্বের নজর এখন ইসলামাবাদে


যুদ্ধবিরতির পর পাল্টাপাল্টি হুমকি দিয়ে চলেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। চুক্তি না হলে আরও বড় হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন নেতারা। অস্ত্রের ট্রিগারে হাত এখনো রয়েছে—এমন হুমকি দিচ্ছে ইরানের নেতৃত্ব। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে কর্তৃত্ব ও লেবাননে ইসরায়েলের হামলা নিয়ে বাগযুদ্ধ তীব্র হচ্ছে। তেহরান ও পাকিস্তান শুরু থেকে বলে আসছে, লেবাননও যুদ্ধবিরতির অংশ। তবে তা মানতে নারাজ তেল আবিব ও ওয়াশিংটন। ইসরায়েল লেবাননের ইরানপন্থি হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে বড় বড় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যা রীতিমতো ঝুঁকিতে ফেলেছে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে। হামলা শুরুর পর প্রথমবারের মতো টেলিফোনে আলাপ করেছেন ইরান ও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। তারা যুদ্ধবিরতি ও সংঘাত নিয়ে আলোচনা করেন। যুদ্ধ, হামলা, হুমকির মধ্যে সংকটের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে ইসলামাবাদে আলোচনার টেবিলে বসছেন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা। আজ শুক্রবার পাকিস্তানের এই রাজধানী শহরে তারা একত্রিত হচ্ছেন। এ বৈঠক ঘিরে বিশ্বের যুদ্ধবিরোধী শান্তিপ্রিয় মানুষের নজর এখন ইসলামাবাদে।
পাকিস্তানে বৈঠকে অংশ নেওয়ার বিষয়ে আগেই নিশ্চিত করেছে ইরান। দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনার জন্য ইরানের প্রতিনিধিদল পাকিস্তানে যাবে।
ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি এ কথা জানিয়েছে। সাঈদ খাতিবজাদেহ বলেছেন, যে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর আগে কিছু শর্ত থাকে। যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ করতে হবে। এই অঞ্চলে যে কোনো শান্তির ক্ষেত্রে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে উল্লেখ করে সাঈদ খাতিবজাদেহ বলেন, ‘আগামী কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার আগে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছিলেন, লেবাননও যুদ্ধবিরতির অংশ। ইরানও একই কথা বলছে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, লেবানন যুদ্ধবিরতিতে যুক্ত নয়। আর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, যেখানে প্রয়োজন সেখানে গিয়ে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালাবে ইসরায়েল। বিশ্লেষকরা বলছেন, লেবাননে ইসরায়েলের চলমান হামলা যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন। এর ফলে আলোচনাগুলো অর্থহীন হয়ে যাবে। পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ইরান লেবাননের জনগণের সঙ্গেই থাকবে। এদিকে লেবানন যুদ্ধবিরতির ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তেহরান যদি ওয়াশিংটনের সঙ্গে হওয়া চুক্তি পুরোপুরি মানতে ব্যর্থ হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা শুরু করবে। যুক্তরাষ্ট্রের সময় বুধবার ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ইরানকে এই হুমকি দেন।
চুক্তি মানা বা না মানা প্রসঙ্গে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘যদি কোনো কারণে তা না হয় (চুক্তি মানা না হয়)—তেমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম—তাহলে গোলাবর্ষণ শুরু হবে। আরও বড়, আরও ভয়াবহ এবং আরও শক্তিশালীভাবে তা হবে, যা আগে কেউ কখনো দেখেনি।’
ট্রাম্প এদিন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক জাহাজ ও যুদ্ধবিমান ইরানের আশপাশে অবস্থান করবে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত। হুমকি পাল্টা হুমকির মধ্যে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিতে একটি ইরানি প্রতিনিধিদল বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। আজ শুক্রবার ইসলামাবাদে এই আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে। ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে ইরানি প্রতিনিধিদলের বৈঠক হওয়ার কথা। পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এই আলোচনা ইরান প্রস্তাবিত ১০ দফার ভিত্তিতে হবে। ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকছেন দেশটির স্পিকার।
তবে দফাগুলো ঠিক কী কী, তা নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি রয়েছে। মোগাদ্দাম আরও বলেছেন, ইসরায়েলের বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের মাধ্যমে কূটনৈতিক উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ইরানি জনগণের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে। সেই সংশয় থাকা সত্ত্বেও এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
উপসাগরীয় উত্তেজনার মধ্যে সৌদি-ইরান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোনালাপ: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ। সৌদির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন। অঞ্চলের নিরাপত্তা-স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে উত্তেজনা কমানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথভাবে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরানও জবাব দেয়। এর অংশ হিসেবে তারা ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালায়। গতকাল মঙ্গলবার রাতে দুই সপ্তাহ যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম ইরান ও সৌদির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ হলো।
বিশ্বের নজর এখন ইসলামাবাদে: হঠাৎ ঘোষিত দুদিনের সরকারি ছুটিতে নিস্তব্ধ ইসলামাবাদের রাজপথ। তবে কড়া নিরাপত্তার আড়ালে পর্দার অন্তরালে চলছে ব্যস্ত কূটনৈতিক তৎপরতা। পুরো বিশ্বের নজর এখন এ শহরের দিকেই। এখানেই সাপ্তাহিক ছুটিতে বসতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সেই বহুল প্রতীক্ষিত সরাসরি বৈঠক, যা সফল হলে থামতে পারে হাজার হাজার মানুষের প্রাণঘাতী এক যুদ্ধ।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেই পাকিস্তান কিছু দিন আগেও উগ্রবাদ আর নড়বড়ে অর্থনীতির কারণে বিশ্বজুড়ে সমালোচিত ছিল, সে ইসলামাবাদই এখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায়। অথচ প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, পাকিস্তানের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রতারণা’ ছাড়া কিছুই পায়নি। ২০১১ সালে ওসামা বিন লাদেনের অ্যাবোটাবাদে ধরা পড়ার ঘটনা দেশটিকে বিশ্বদরবারে প্রায় একঘরে করে দিয়েছিল। এমনকি জো বাইডেন তার পুরো মেয়াদে পাকিস্তানের কোনও প্রধানমন্ত্রীকেই ফোন করেননি।
কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সব ওলটপালট হয়ে গেছে। ট্রাম্প এখন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে তার ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে ডাকছেন। এই বিস্ময়কর পরিবর্তনের মূলে রয়েছে পাকিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের খনিজ সম্পদের ভান্ডার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধ থামানোর পেছনে ইসলামাবাদের নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। পাকিস্তান তার জ্বালানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে, যা হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় চরম সংকটে পড়েছে। এ ছাড়া সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে রিয়াদ যুদ্ধে জড়ালে পাকিস্তানেরও জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ছিল। এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের ফারওয়া আমের বলেন, ‘পাকিস্তান নিজেকে এমন এক অনন্য অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখান থেকে তেহরান ও ওয়াশিংটন উভয়পক্ষের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখা সম্ভব হয়েছে।’
পাকিস্তানের এই সাফল্যে বেইজিংয়ের পরোক্ষ সমর্থন বড় ভূমিকা রেখেছে। গত সপ্তাহে পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইছহাক দারের বেইজিং সফর ইরানের নমনীয় হওয়ার পেছনে কাজ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। চীনের সম্মতির সঙ্গে পাকিস্তানের তদবির মিলে যাওয়ায় ইরানিদের জন্য আলোচনার টেবিলে আসা সহজ হয়েছে।
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

চীনে বাংলাদেশের প্রথম বিনিয়োগ কার্যালয় খোলার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর
চীনে শিগগিরই বাংলাদেশের প্রথম বিনিয়োগ কার্যালয় খোলার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।বিস্তারিত পড়ুন

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রীর সাক্ষাৎ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগেরবিস্তারিত পড়ুন

মহাকাশে বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল ট্রাইওন্ডা নিয়ে গবেষণা
ফুটবল বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল ‘ট্রাইওন্ডা’ পৌঁছে গেছে পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে মহাকাশে। আন্তর্জাতিকবিস্তারিত পড়ুন


