যশোরের রাজগঞ্জে প্রক্রিয়াজাত শিশু খাবারের ছড়াছড়ি, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি


যশোরের মণিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জ বাজারসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের জন্য তৈরি ও শিশুদের আকৃষ্ট করে এমন প্রক্রিয়াজাত খাবারের ছড়াছড়ি দেখা গেছে। পটেটো চিপস, বিভিন্ন ধরনের জুস, বিস্কুট, কেক, পাউরুটি, চকলেট ও নানা রঙ-বেরঙের প্যাকেটজাত খাবারে সয়লাব বাজারের মুদি দোকান ও ছোট-বড় খাবারের দোকানগুলো। আকর্ষণীয় মোড়ক ও স্বাদের কারণে এসব খাবারের প্রতি শিশুদের আগ্রহও দিন দিন বাড়ছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, শিশুদের অনেকেই নিয়মিত এসব খাবার খাওয়ার কারণে পেটের সমস্যা, ক্ষুধামন্দা, দাঁতের ক্ষয়, দুর্বলতা ও বিভিন্ন ধরনের শারীরিক অস্বস্তিতে ভুগছে। তবে এসব সমস্যার সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো পণ্যকে সরাসরি দায়ী করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজগঞ্জ বাজার ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ দোকানেই শিশুদের চোখে পড়ার মতো জায়গায় সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের চিপস, জুস, বিস্কুট, কেক, চকলেট ও অন্যান্য প্যাকেটজাত খাবার। স্কুলগামী শিশুদের অনেকেই টিফিনের পরিবর্তে কিংবা টিফিনের পাশাপাশি এসব খাবার কিনে খাচ্ছে। বিশেষ করে স্বল্পমূল্যের চিপস ও বিভিন্ন ফ্লেভারের পানীয় শিশুদের মধ্যে বেশি জনপ্রিয়।
স্থানীয় অভিভাবকরা বলছেন, কর্মব্যস্ততার কারণে অনেক সময় সন্তানকে ঘরে তৈরি খাবার দেওয়ার পরিবর্তে দোকান থেকে সহজে পাওয়া প্যাকেটজাত খাবার কিনে দিতে হয়। আবার শিশুরা বিজ্ঞাপন ও আকর্ষণীয় প্যাকেট দেখে এসব খাবারের জন্য বায়না ধরলে অনেক অভিভাবকও বাধ্য হয়ে তা কিনে দেন।
রাজগঞ্জের আশরাফুল ইসলাম নামের এক অভিভাবক বলেন, শিশুরা পটেটো, বিস্কুট, কেক কিংবা জুসের জন্য বায়না ধরলে সব সময় না করা কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু এসব খাবার খাওয়ার পর অনেক সময় ওদের ক্ষুধা কমে যায়। এখন থেকে যতটা সম্ভব ঘরের তৈরি খাবার দেওয়ার চেষ্টা করছি।
মশিয়ার রহমান নামের আরেক অভিভাবক বলেন, প্যাকেটের গায়ে অনেক উপাদানের নাম লেখা থাকে, কিন্তু কোনটা শিশুর জন্য কতটা ক্ষতিকর বা উপকারী তা আমরা বুঝতে পারি না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বাজারে বিক্রি হওয়া শিশুদের খাবারের মান নিয়মিত পরীক্ষা করা।
রাজগঞ্জের সচেতন নাগরিকরা বলছেন, শুধু অভিভাবকদের সচেতন হলেই হবে না, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। বিশেষ করে মেয়াদোত্তীর্ণ, নিম্নমানের কিংবা অনিরাপদ উপাদানযুক্ত খাবার বাজারজাত হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।
রাজগঞ্জের এক সচেতন নাগরিক বলেন, শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের খাবার নিয়ে কোনো ধরনের আপস করা উচিত নয়। দোকানে কী বিক্রি হচ্ছে এবং শিশুদের হাতে কী তুলে দেওয়া হচ্ছে—এ বিষয়ে অভিভাবক ও ব্যবসায়ী উভয়কেই দায়িত্বশীল হতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সব প্রক্রিয়াজাত খাবারই সমানভাবে ক্ষতিকর নয়। তবে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এসব খাবার বেশি খেলে শিশুর স্বাভাবিক ও পুষ্টিকর খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের অভ্যাস স্থূলতা, দাঁতের ক্ষয় এবং অন্যান্য খাদ্যাভ্যাসজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।
পুষ্টিবিদ ও শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শিশুদের খাবারের তালিকায় ভাত, ডাল, মাছ, ডিম, দুধ, শাকসবজি ও মৌসুমি ফলের মতো পুষ্টিকর ও তুলনামূলকভাবে কম প্রক্রিয়াজাত খাবারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্যাকেটজাত খাবার একেবারে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে খাবারের উপাদান, পুষ্টিমান, মেয়াদ ও নিরাপত্তা যাচাই করে পরিমিত খাওয়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও উচ্চ চিনি-লবণ-চর্বিযুক্ত খাবারের অভ্যাস কমানো জরুরি। অভিভাবকদের খাবারের মোড়কে থাকা উপাদান ও পুষ্টি-তথ্য পড়ার অভ্যাস করতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ঘরে তৈরি পুষ্টিকর খাবার ও ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
এদিকে স্থানীয়দের দাবি, রাজগঞ্জ বাজারে শিশুদের জন্য বিক্রি হওয়া প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের মান যাচাইয়ে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অভিযান পরিচালনা করা হোক। বিশেষ করে মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল, নিম্নমানের কিংবা লেবেলবিহীন খাদ্যপণ্য বিক্রি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিভাবকদের ভাষ্য, শিশুদের হাতে রঙিন প্যাকেট তুলে দিয়ে সাময়িক আনন্দ দেওয়া গেলেও এর পরিবর্তে যদি ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা যায়, সেটিই হবে তাদের ভবিষ্যৎ সুস্থতার জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

মণিরামপুরে গরু চুরির হিড়িক, ১০ দিনে অন্তত ৩০ গরু চুরি
যশোরের মণিরামপুর উপজেলায় হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে গরু চুরির ঘটনা। গত ১০বিস্তারিত পড়ুন

মণিরামপুর ও রাজগঞ্জে দেদারছে বিক্রি হচ্ছে ‘জেলি পুশ’ চিংড়ি
যশোরের মণিরামপুর ও রাজগঞ্জ বাজারে দেদারছে বিক্রি হচ্ছে কথিত ‘জেলি পুশ’ করাবিস্তারিত পড়ুন

মণিরামপুরে শাশুড়িকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, পুলিশের হাতে পুত্রবধূ ও তার মা
রাজগঞ্জ প্রতিনিধি : যশোরের মণিরামপুরে পুষ্পা দাস (৪৫) নামে এক বিধবা নারীকেবিস্তারিত পড়ুন


