সাবেক সমন্বয়ক মাহদীর সঙ্গে দিল্লিতে ঠিক কী হয়েছিল, জানা গেল


বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও হবিগঞ্জ জেলা শাখার সদস্য সচিব মাহদী হাসানের সঙ্গে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ঠিক কী হয়েছিল, তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে গত কদিন ধরেই নানা আলোচনা চলেছে।
মাহদী হাসান বাংলাদেশে ফিরেছেন বুধবার বিকালে।
মাস খানেক আগে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওর কারণে তাকে নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ থানায় বসে প্রকাশ্যেই মাহদী হাসান ওসি আবুল কালামকে হুমকি দিচ্ছেন এই বলে যে, তারা বানিয়াচং থানা পুড়িয়েছেন এবং এস আই সন্তোষ চৌধুরীকে জ্বালিয়ে দিয়েছেন।
এই বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার মুখে গত জানুয়ারিতে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারের প্রতিবাদে তার সমর্থকদের বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে তাকে মুক্তি দেওয়া হলে তা নিয়েও হয় সমালোচনা।
সম্প্রতি তিনি দিল্লিতে গিয়েছিলেন পর্তুগালের ভিসা নিতে। সেখানেই তাকে কেউ একজন চিনে ফেলে এবং একটা ভিডিও রেকর্ড করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এরপরেই সক্রিয় হয়ে ওঠেন ভারতের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
ওই কর্মকর্তারা মঙ্গলবার আর বুধবার তার ওপরে কীভাবে নজর রেখেছিলেন আর শেষমেষ তার সঙ্গে ঠিক কী কী করা হয়েছে, তা জানতে পেরেছে বিবিসি বাংলা।
এমন দুজন ব্যক্তির সঙ্গে বিবিসি বাংলা পৃথকভাবে কথা বলেছে, যারা গোটা ঘটনাক্রম সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল।
অবশ্য তাদের নাম উল্লেখ করা হবে না, এই শর্তেই কথা বলেছেন।
তারা দুজনেই বলেছেন যে, মাহদী হাসানকে শারীরিকভাবে নিগ্রহ করা হয়নি কোথাও। তবে এটা তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, ‘ভারত-বিরোধী কথা বলে এবং বাংলাদেশের এক হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তাকে মেরে ফেলার প্রকাশ্য দাবি করে- এমন কোনো ব্যক্তিকে ভারতে অবস্থান করতে দেওয়া হবে না। তাকে এটাও বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, নিজের দেশেই ফিরে যাওয়া ছাড়া তার অন্য কোনো উপায় নেই।’
ওই দুইজনের দেওয়া তথ্যের ওপরে ভিত্তি করেই এই প্রতিবেদন।
কনট প্লেস, মঙ্গলবার বেলা ১১টা
দিল্লির প্রাণকেন্দ্র কনট প্লেসে একটি বেসরকারি সংস্থার দফতরে মঙ্গলবার সকালে প্রথম দেখা যায় মাহদী হাসানকে। তার পাশে এক নারীও বসেছিলেন। ওই বেসরকারি সংস্থাটি বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের হয়ে ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াকরণ করে থাকে।
জানা গেছে যে মাহদী হাসান এবং তার পাশে বসা নারী পর্তুগালের ভিসার জন্য আবেদন করতে গিয়েছিলেন।
পর্তুগালের ভিসা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের নাগরিকদের দিল্লিতে আসতে হয়, সে জন্য ভারতীয় ভিসা লাগে। জানা গেছে যে, বাংলাদেশের ভারতীয় দূতাবাস মাহদী হাসানকে ভিসা দিয়েছিল।
মাহদী এবং তার সঙ্গে আসা এক নারী নিউ দিল্লি রেল স্টেশনের কাছাকাছি পাহাড়গঞ্জ এলাকার একটি হোটেলে ওঠেন বলে বিবিসি বাংলা জানতে পেরেছে।
কনট প্লেসের ওই ভিসা কেন্দ্রে অপেক্ষা করার সময়ে কেউ তার ভিডিও রেকর্ড করে নেয়। সেই ব্যক্তি যে কে, সেটা কেউ জানাতে চাননি। তবে তিনি যে মাহদী হাসানকে চিনতে পেরেছিলেন, এটা নিশ্চিত।
ভিডিও রেকর্ডকারী ব্যক্তিও সেখানে ভিসা নিতেই গিয়েছিলেন।
তবে সেই ব্যক্তি পর্তুগালের জন্য নয়, অন্য কোনো দেশের ভিসা পাওয়ার আবেদন জানাতে গিয়েছিলেন বলে বিবিসি বাংলা জানতে পেরেছে।
‘মঙ্গলবার সকাল ১১টা নাগাদ মাহদী হাসানকে চিহ্নিত করা যায়। আমরা কিছুক্ষণের মধ্যে খবর পেয়ে যাই। সেই সময়েই পর পর তার কাছে ভারতীয় আর বাংলাদেশের নানা নম্বর থেকে ফোন আসতে শুরু করে। সেই সব ফোন কারা করছিল, সেটা বলব না, কিন্তু তখনই মাহদী হাসান আন্দাজ করে যে কোথাও একটা গন্ডগোল হয়েছে।’
‘একটা নতুন দেশে এসে, যেখানে তাকে কেউ চেনে না– তার কাছে হঠাৎ করে কেন এত অজানা নম্বর থেকে ফোন আসবে! এটা তাকে চিন্তায় ফেলে দেয়। অন্যদিকে কর্মকর্তারা তার ওপরে নজর রাখা শুরু করেন,’ জানাচ্ছিলেন পুরো ঘটনাক্রম সম্বন্ধে জানেন, এমন একটি সূত্র।
অন্য সূত্রটি বলছে, যে ওই ভিসা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে তিনি প্রথমে পুরোনো দিল্লির জামা মসজিদ এলাকায় গিয়েছিলেন।
‘বেলা দুটো থেকে আড়াইটের মধ্যে তার (মাহদী) কাছে বাংলাদেশ থেকে কেউ জানায় যে সে চিহ্নিত হয়ে গেছে। তখন সে নিশ্চিত হয় যে অজানা নম্বরগুলো থেকে কারা, কেন ফোন করছিল। এরপরেই সে দিল্লিতে কয়েকটি জায়গায় গিয়েছিল আশ্রয়ের সন্ধানে। কেউই তাকে থাকতে দিতে রাজি হয়নি,’ বলছিলেন একটি সূত্র।
‘দিল্লি ছাড়তে হবে’
বিবিসি বাংলা যে দুজনের সঙ্গে কথা বলেছে, তাদের একজন জানিয়েছেন, মাহদী হাসান দিল্লি থেকেই ভিসা নিয়ে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তার সঙ্গে যে নারী ছিলেন, তিনি মাহদী হাসানেরই এক আত্মীয়া।
ওই সূত্রটিই বলেছে যে, পরবর্তী সময়ে খরচের জন্য ক্রিপ্টো-কারেন্সি নিয়ে ভারতে এসেছিলেন মাহদী হাসান এবং তার পরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় ৪০ লক্ষেরও বেশি।
তবে অন্য সূত্রটি ‘এটা আমার এখতিয়ারে পড়ে না’ বলে অর্থের পরিমাণ সম্বন্ধে কিছু জানাতে পারেননি। তিনি এটাও নিশ্চিত করতে পারেননি যে মাহদী হাসান দিল্লি থেকেই লিসবনে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন কিনা।
তবে মাহদী হাসানকে কেউ পরামর্শ দেন যে তিনি যেন পাহাড়গঞ্জের হোটেল থেকে সরে যান এবং বিমানবন্দরের কাছাকাছি কোনো হোটেলে ওঠেন।
পাহাড়গঞ্জের হোটেল থেকে কাউকে দিয়ে তিনি নিজের ব্যাগ-সুটকেস আনিয়ে বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি হোটেলে ওঠেন মঙ্গলবার সন্ধ্যায়।
দিল্লি-ঢাকা ইন্ডিগোর বিমানের টিকিট তাকে পৌঁছিয়ে দেওয়া হয় রাতেই।
‘ভিসা বাতিল’
একদিকে মাহদী হাসানের ওপরে নজর রাখা যেমন চলছিল, অন্যদিকে ভারতীয় কর্মকর্তারা খোঁজ করছিলেন যে ‘ভারতবিরোধী কথা বলা কোনো ব্যক্তিকে ঢাকার ভারতীয় দূতাবাস ভিসা কী করে দিল’- সেই প্রশ্নের উত্তর।
একটি সূত্র বলছে, ‘সে সম্ভবত বাংলাদেশে কোনো এজেন্টকে দিয়ে ভারতের ভিসা জোগাড় করেছিল। আর তার বিরুদ্ধে ভারতে তো কোনো মামলা নেই। সে পর্তুগালের ভিসা নেওয়ার জন্য ভারতে আসতে চেয়েছিল। তাই কীভাবে তার ভিসার আবেদন বাতিল করা যেত?’
অন্য সূত্রটি জানাচ্ছে, ‘যেভাবেই ভিসা জোগাড় করে থাক সে, তার ভিসা রাতেই বাতিল করানো হয়েছে। সেই খবর অবশ্য সে আগে জানতে পারেনি।’
দুটি সূত্রই বলছে, মাহদী হাসান এটা মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যেই বুঝে গিয়েছিলেন যে তার পক্ষে আর এক দিনও ভারতে থাকা সম্ভব না। এমনকি পর্তুগালের ভিসার জন্য তাকে কনট প্লেসের ওই বেসরকারি সংস্থা দফতরে বুধবার সকালে দ্বিতীয়বার যেতে বলা হলেও সেখানে যে তিনি যেতে পারবেন না, এটা বুঝে গিয়েছিলেন।
‘বিমানবন্দরের কাছের ওই হোটেলে সকালের জলখাবার খেয়ে ৮টা ১০ মিনিটে সে রওনা দেয়, আর ৮টা ৫০ মিনিট নাগাদ সিকিউরিটি চেক করতে এগোয়,’ বিবিসিকে জানিয়েছে দুটি সূত্রই।
তারা দুজনে জানাচ্ছেন যে, ইন্ডিগোর ১২টা ৪০ মিনিটের ফ্লাইটের টিকিট ছিল তার কাছে। এটা দিল্লি বিমানবন্দরে একটি সেলফি ভিডিও করার সময়ে নিজেও জানিয়েছিলেন তিনি। ওই ভিডিওটি তিনি সামাজিক মাধ্যমে আপলোডও করেছেন। সেখান তিনি হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছেন।
একটি সূত্র বলছে, মাহদী ‘বিমান সংস্থার চেক ইন কাউন্টারে গিয়ে তিনি নিজের বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করে সিকিউরিটি চেকের জন্য এগোন’।
‘নিরাপত্তা চেকিংয়ের জন্য তিনি নিজের লাগেজ স্ক্যানারের কনভেয়র বেল্টে দেন। লাগেজ এগিয়ে যায়, তিনি লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই সময়েই এক ভারতীয় কর্মকর্তা তাকে একটু সরে আসতে বলেন,’ জানিয়েছে একটি সূত্র।
জেরা শুরু
নিরাপত্তা চেকিংয়ের লাইন থেকে তাকে সরিয়ে এনে শুরু হয় জেরা।
‘বিভিন্ন এজেন্সির কর্মকর্তারা তাকে জেরা করেন, খুব শান্তভাবে, কোনো শারীরিক নিগ্রহ ছাড়াই,’ বলছে দুটি সূত্রই।
তাদের একজন বলছেন, যে মাহদী হাসান যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, সেটা তো বাংলাদেশের বিষয়, ভারত কেন সেখানে মাথা ঘামাবে।
তবে একটি সূত্র বলছে, ‘আমাদের তিনটে পয়েন্ট ছিল। প্রথমত সে ভারতকে অপমান করেছে, কটূ কথা বলেছে। দ্বিতীয়ত সে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে বলে প্রকাশ্যে দাবি করেছে, তাই সে একজন সন্দেহভাজন ক্রিমিনাল। তৃতীয় পয়েন্টটাই সবথেকে গুরুত্ব পেয়েছে আমাদের কাছে, সে একজন হিন্দু অফিসারকে মেরেছে বলে দাবি করেছে। এত কিছুর পরেও সে দিল্লিতে আসবে আর এখান থেকে অন্য কোনো দেশে চলে যাবে, আর আমরা চুপ করে বসে থাকব?’
প্রায় আধঘণ্টা তাকে জেরা করা হয় দিল্লির বিমানবন্দরেই। দুটি সূত্রই জানাচ্ছে, তাকে কোনোরকম শারীরিক নিগ্রহ করা হয়নি।
বাংলাদেশে ফিরে কী বললেন মাহদী হাসান?
দিল্লি থেকে বুধবার বিকেলে ইন্ডিগোর বিমানে বাংলাদেশে ফিরেছেন মাহদী হাসান। বিমানবন্দরেই কয়েকজন সাংবাদিক তাকে ঘিরে ধরে জানতে চান যে দিল্লিতে তার সঙ্গে ঠিক কী হয়েছিল।
গোড়ায় তিনি সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলেন না। অপেক্ষমান গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতেই তিনি বলেন, “বলব আমরা, জানাবো, জানাবো”।
এরপরে তিনি বলেন, ‘আমাকে এসএডি লিডার, বৈষম্যবিরোধী নেতা বলে আটক করা হয়েছিল। তারপর হচ্ছে আমাকে প্রচন্ড হ্যারাস করা হয়েছে। আমি ফুল লাইফ রিস্কে ছিলাম।’
‘এটা আমি বলি না, যে কোনো অন্য একটা দেশের নাগরিককে যে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেটা দেয় নাই। সো এইটা আমরা ডিটেইলসে জানাবো পরে’, সংবাদ মাধ্যমকে জানান তিনি।
একজন সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “আপনার ওয়ালেটে নাকি ক্রিপ্টো কারেন্সি পাওয়া গিয়েছিল, সেই বিষয়টা যদি ক্লিয়ার করেন”।
জবাবে তিনি বলেন যে ওগুলো ‘গুজব’।
বাংলাদেশে ফেরার পরেও বিমানবন্দরেও এক দফা জেরার মুখে পড়তে হয়, সেটাও জানান মি. হাসান।
‘আমাকে আটকানো হয়েছিল, জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বাংলাদেশেও। পরবর্তীকালে আমাকে ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হয়’, মন্তব্য মাহদী হাসানের।
ভারতের যে দুটি সূত্র থেকে মাহদী হাসানকে ঘিরে দিল্লির ঘটনাবলী সম্পর্কে বিবিসি বাংলা জানতে পারে, সেই ব্যাপারে তার বক্তব্য জানতে দুদিন ধরে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি আমরা।
কিন্তু কোনোভাবেই তার সঙ্গে ফোনে কথা বলা যায়নি।
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ ইস্যুতে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাল ভারত
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল,বিস্তারিত পড়ুন

নিজ দল থেকে মমতার বিদায়, তৃণমূলের চেয়ারম্যান হলেন অরূপ রায়
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের পর এক সময় যা কল্পনাতেও ভাবা কঠিন ছিল, শেষবিস্তারিত পড়ুন

বাংলাদেশ সীমান্তে একাধিক আধুনিক স্থলবন্দর করবে ভারত
বাংলাদেশ ও নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য এবং যাত্রী চলাচল আরও সহজ করতে পশ্চিমবঙ্গেবিস্তারিত পড়ুন


