চাহিদার চেয়ে ১ কোটি টন বেশি চাল উৎপাদন


মিঠুন সরকার, যশোর: সবুজ বাংলার বিস্তীর্ণ প্রান্তরজুড়ে এখন কৃষকের সাফল্যের সোনালি হাসি। হাওর থেকে সমতল-সবখানেই যেন ধানের রাজত্ব। একসময়ের খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশ আজ কেবল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণই নয়, বরং প্রধান খাদ্যশস্য চাল উৎপাদনে গড়েছে উদ্বৃত্তের এক অনন্য রেকর্ড।
সরকারের নীতিগত সহায়তা, কৃষি বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণা এবং প্রান্তিক কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে দেশে বর্তমানে চাহিদার চেয়ে ১ কোটি টনেরও বেশি চাল উদ্বৃত্ত থাকছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতি ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল মাইলফলক।
সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য পর্যালোচনায় দেশের চাল উৎপাদনের এই অভাবনীয় সাফল্যের চিত্র উঠে এসেছে।
পরিসংখ্যানে অভাবনীয় সাফল্য:
সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ এক জাদুকরী প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও মাথাপিছু ব্যবহারের ভিত্তিতে দেশে বর্তমানে বার্ষিক চালের চাহিদা ৩ কোটি ৭ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯ লাখ টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
এর বিপরীতে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণভাবে চাল উৎপাদিত হয়েছে ৪ কোটি ২৪ লাখ টন। অর্থাৎ, দেশে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ মোট চাহিদার চেয়ে চালের উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টন বেশি। উৎপাদনের এই বিপুল ব্যবধান প্রমাণ করে যে, দেশের চালের বাজার এখন যেকোনো অভ্যন্তরীণ বা বৈশি^ক সংকট মোকাবিলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।
উদ্বৃত্ত উৎপাদনের নেপথ্য কারিগর:
চাল উৎপাদনে আজকের এই পাহাড়সম সাফল্যের পেছনে রয়েছে বহুমুখী উদ্যোগের সমন্বয়। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উচ্চফলনশীল (উফশী) ও হাইব্রিড জাতের ধানের ব্যাপক সম্প্রসারণ এবং খরা, লবণাক্ততা ও জলমগ্নতা-সহিষ্ণু নতুন জাত উদ্ভাবন এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
এর পাশাপাশি, কৃষকদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন সার সরবরাহ, সেচ সুবিধার সম্প্রসারণ এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণে সরকারি ভর্তুকি এই উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল ফলানোর আধুনিক নিবিড় চাষাবাদের কারণে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমলেও মোট উৎপাদন জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তায় স্বস্তির নিঃশ্বাস বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধবিগ্রহ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘœ ঘটার কারণে বিশ^জুড়ে যখন খাদ্যসংকটের শঙ্কা তৈরি হচ্ছে, তখন চালের এই বিপুল উদ্বৃত্ত বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল স্বস্তির জায়গা। ১ কোটির টনেরও বেশি উদ্বৃত্ত চালের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা বা আমদানি-নির্ভরতার কোনো নেতিবাচক প্রভাব দেশের প্রধান খাদ্যশস্যের ওপর পড়ছে না।
এটি একইসঙ্গে সরকারের বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে, যা অর্থনীতির অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করেছে।
কৃষকের ন্যায্যমূল্য ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ
উদ্বৃত্ত উৎপাদনের এই ধারা অব্যাহত রাখতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রান্তিক কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষা। বিপুল পরিমাণ চাল উৎপাদনের ফলে বাজারে যেন ধানের দামে ধস না নামে এবং কৃষক যেন তার ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত না হন, সেদিকে কড়া নজর দেওয়া জরুরি। বাম্পার ফলনের সময় সঠিক মূল্যে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।
এছাড়া, দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণের জন্য আধুনিক সাইলো বা গুদামের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। উদ্বৃত্ত চাল প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানির নতুন বাজার খোঁজার বিষয়েও এখন নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে।
একসময়ের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ ঘুচিয়ে বাংলাদেশ আজ খাদ্য উৎপাদনে বিশে^র কাছে এক রোল মডেল। ধানের এই সোনালি বিপ্লব শুধু কৃষকের পেটই ভরায়নি, বরং জাতীয় অর্থনীতিকে এনে দিয়েছে এক সুদৃঢ় ভিত্তি। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও কৃষকবান্ধব নীতি অব্যাহত থাকলে চাল উৎপাদনের এই ধারাবাহিকতা আগামী দিনগুলোতেও দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে অটুট রাখবে।
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

নতুন দায়িত্ব পেলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
দেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের জন্য আট সদস্যের একটি কমিটিবিস্তারিত পড়ুন

ডেঙ্গুতে একদিনে ১০ জনের মৃত্যু
দেশে গত একদিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ১০ জনের মৃত্যু এবং ১বিস্তারিত পড়ুন

জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ পরিচ্ছন্ন রাখা ও সংস্কারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ পরিচ্ছন্ন রাখা, সবুজায়ন ও প্রয়োজনীয়বিস্তারিত পড়ুন


