বাংলাদেশ অন্য দেশের অংশীদার হতে চায়, নির্ভরশীল নয়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী


বাংলাদেশ এখন আর কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। বাংলাদেশ এখন নির্ভরশীলতা থেকে বের হয়ে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের দিকে এগিয়ে যেতে চায় বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত ‘শ্রমশক্তি থেকে কৌশলগত অংশীদারত্ব: বাংলাদেশ-সৌদি আরব সম্পর্কের নতুন দিগন্ত’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘নির্ভরশীলতার দিন শেষ। বাংলাদেশ কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না এবং কোনো দেশের সহায়তার ওপরও নির্ভর করতে চায় না। বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের অংশীদারত্বের দিকে এগিয়ে যাবে।’
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সম্পর্কের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কল্যাণ, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘একটি কৌশলগত অংশীদারত্বের অবশ্যই শক্তিশালী মানবিক দিক থাকতে হবে। সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মীদের কল্যাণ, মর্যাদা ও অধিকার আমাদের সরকারের অগ্রাধিকার। শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিক ও নিয়োগকর্তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় সৌদি আরবের সহযোগিতাকে আমরা স্বাগত জানাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই, আমাদের কর্মীদের শুধু শ্রমশক্তির উৎস হিসেবে দেখা হবে না, বরং উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হবে।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বেসরকারি খাত, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সৌদি আরবের আরও বেশি সম্পৃক্ততার সুযোগ রয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশ-সৌদি আরব সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায় শুধু পরিমাণ দিয়ে নয়, বরং মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। বেশি কর্মী পাঠানোর অর্থ হতে হবে আরও বেশি দক্ষতা অর্জন। বেশি বাণিজ্যের অর্থ হতে হবে পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি। বেশি বিনিয়োগের অর্থ হতে হবে প্রযুক্তির প্রসার। আর শক্তিশালী রাজনৈতিক সম্পর্কের অর্থ হতে হবে দুই দেশের মধ্যে আরও দৃঢ় অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্ব।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চায়। এটি আমাদের সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারগুলোর একটি।’
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৌদি আরবের সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি। এটি যদি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং আমরা যদি মনে করি, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আমাদের অভিজ্ঞতা মুসলিম দেশগুলোর সেবা এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।”
দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রসঙ্গ তুলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, সৌদি আরবের যুবরাজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন এবং শিগগিরই সুবিধাজনক কোনো সময়ে সফর করবেন। একই সঙ্গে সৌদি যুবরাজও বাংলাদেশ সফরে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমরা তাকে তার সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। এটি প্রমাণ করে, দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।”
ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এখন সেই আস্থাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের দূরদৃষ্টি, বিনিয়োগ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার সমন্বয় ঘটাতে হবে। শ্রমশক্তি থেকে মানবসম্পদে, প্রবাসী আয় থেকে বিনিয়োগে এবং প্রচলিত সহযোগিতা থেকে উদ্ভাবনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।”
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নির্ভরশীলতার পরিবর্তে পারস্পরিক স্বার্থ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “আমি শুধু বাংলাদেশ-সৌদি আরব সম্পর্কের কথা বলছি না; বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নির্ভরশীলতার দিন শেষ। বাংলাদেশ কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না, কোনো দেশের সহায়তার ওপরও নির্ভর করতে চায় না। বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের দিকে এগিয়ে যাবে। এতে সবারই লাভ হবে।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে হাত পাতা কোনো দেশ হবে না, বরং বিশ্বের সঙ্গে ব্যবসা করবে।”
অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সফর বাড়ছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দৃশ্যমানভাবে আরও জোরালো হচ্ছে। এই সম্পর্ককে সামগ্রিক ও বহুমাত্রিক অংশীদারত্বে রূপ দিতে প্রচলিত খাতের পাশাপাশি নতুন নতুন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, এই সম্পর্ককে আরও আধুনিক ও বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গিতে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। জ্বালানি ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। আমরা সব ক্ষেত্রেই সহযোগিতার পরিধি বাড়াতে চাই।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি শুধু প্রচলিত প্রাথমিক পর্যায়ের শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আমরা সৌদি আরবে আরও পেশাদার ও দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর দিকে এগিয়ে যেতে চাই। এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে অত্যন্ত ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে ব্যাপক বিনিয়োগ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার অনেক সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ বিনিয়োগ অংশীদারত্বে বিশ্বাস করে বাংলাদেশ। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে আলোচনা হবে। সৌদি আরব বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী এবং দেশটি বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক যেমন শক্তিশালী, তেমনি বিনিয়োগ সম্পর্কও দৃঢ়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন নতুন ক্ষেত্র নিয়ে দুই দেশ আলোচনা করবে। পাশাপাশি দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়েও যোগাযোগ ও মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমান সংকট মোকাবিলাসহ বিভিন্ন খাতে একসঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি। তার মতে, এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে সহযোগিতার নতুন সুযোগ উন্মোচিত হবে।
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

চারদিনের সফরে ২৬ অক্টোবর জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
চারদিনের সফরে আগামী ২৬ অক্টোবর জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সফরেবিস্তারিত পড়ুন

রাষ্ট্রের সংকট সমাধানে তরুণদের প্রশ্ন ও মতামত জরুরি: রিজভী
সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংকট চিহ্নিত করে সমাধানের পথ বের করতে তরুণদেরবিস্তারিত পড়ুন

বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন প্রকল্প দেখলেন প্রধানমন্ত্রী, বাস্তবায়নে সহায়তার আশ্বাস
মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের প্রযুক্তি বাণিজ্যিকবিস্তারিত পড়ুন


