আলোচনা সভায় বক্তারা
৬৮ শতাংশ নারী বাবার বাড়িতেও সহিংসতার শিকার হন


“পিত্রালয়: নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতার এক উপেক্ষিত ক্ষেত্র”(‘দ্য ন্যাটাল ফ্যামিলি: আ নিগলেক্টেড সাইট অব ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন’) শীর্ষক এক বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মঙ্গলবার এনজিও ফোরাম, ব্লক-ই, ৪/৬ লালমাটিয়ায় প্রাগ্রসর আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ভারতের বিশিষ্ট নারীবাদী অধিকারকর্মী এবং ‘স্বয়ম’-এর প্রতিষ্ঠাতা অনুরাধা কাপুর। তিনি পিত্রালয়ে নারীর প্রতি সহিংসতার বিভিন্ন ধরন, এর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপট এবং এ বিষয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ও পলিসি সংক্রান্ত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতাকে আমরা প্রায়ই শুধু স্বামীর বাড়ির নির্যাতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখি। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৬৮শতাংশ নারী বাবার বাড়িতেও সহিংসতার শিকার হন। ছোটবেলা থেকেই অনেক মেয়ের চলাফেরা, বন্ধুর বাড়িতে যাওয়া, বাইরে কাজ করা কিংবা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সীমিত করে দেওয়া হয়, যা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
তিনি বলেন, বাবা-মা, ভাইসহ পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে চরিত্র নিয়ে অপবাদ, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন, মারধর এবং সম্পত্তির অধিকার চাইলে সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকির মতো ঘটনাও ঘটে। এমনকি স্বামীর বাড়িতে নির্যাতনের শিকার হলেও অনেক নারীকে বাবার বাড়িতে ফিরে আসতে দেওয়া হয় না; বরং “মানিয়ে নেওয়ার” পরামর্শ দেওয়া হয়। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন পিত্রালয়ে নারী সহিংসতাকে স্বাভাবিকীকরণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, পরিবারে বাবা-মায়ের সম্পর্ক খারাপ হলে সন্তানের ওপর নির্যাতনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনেক নারী শৈশবের সহিংসতাকে দীর্ঘদিন সহিংসতা হিসেবে চিনতেই পারেন না, কারণ তা সমাজে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে গেছে। তবে তিনি আশার কথা তুলে ধরে বলেন, অনেক নারী এসব পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, নিজস্ব কৌশলে মোকাবেলা করেছেন এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের পথ খুঁজে নিয়েছেন।
ইউ ক্যানের নির্বাহী পরিচালক জিনাত আরা হক বলেন, সমাজে আমরা ‘বাবার বাড়ি’ বলি, কিন্তু ‘মায়ের বাড়ি’ বলি না—এই ভাষাই নারীর অধিকারহীনতার বাস্তবতাকে প্রকাশ করে। ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের শেখানো হয় জমি-সম্পত্তি তাদের বিষয় নয়; তাদের ভূমিকা কেবল গৃহস্থালির কাজে সীমাবদ্ধ। এই বৈষম্যের মধ্য দিয়েই অনেক নারী নিজেকে দ্বিতীয় লিঙ্গ হিসেবে ভাবতে শেখেন। তিনি বলেন, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্র—প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সহিংসতামুক্ত করতে হবে, আর সেই পরিবর্তনের শুরু হতে হবে পরিবার থেকেই।
উত্তরাধিকার ও বৈষম্য প্রসঙ্গে নারী প্রগতি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শাহানাজ সুমি বলেন, পরিবারে সম্পত্তিতে সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে অনেক মেয়ের ভাগ্য যেন আগেই নির্ধারিত হয়ে যায়। শৈশব থেকেই তারা জীবনের নানা ক্ষেত্রে কম সুযোগ, কম গুরুত্ব ও কম অধিকার পেতে পেতে বড় হয়। তিনি বলেন, এই বৈষম্যকে আর স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে না। কেন একজন মেয়ের সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে, কেন তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, কেন তার প্রতি নির্যাতন হচ্ছে—এসব প্রশ্ন এখনই জোরালোভাবে তুলতে হবে। অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পরিবার থেকেই সচেতনতা, প্রতিবাদ ও পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। অধিকারকর্মী, শিক্ষার্থী, উন্নয়নকর্মী, গবেষক, শিক্ষক, নারী আন্দোলনের কর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নিয়ে পিত্রালয়ে নারীর প্রতি সহিংসতার বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় করেন।
আলোচনায় অন্যান্যরা বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়টি শুধু বৈবাহিক পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে দেখলে সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়ালে থেকে যায়। পিত্রালয়েও নারীরা বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হতে পারেন। তাই নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বৈবাহিক পরিবারের পাশাপাশি পিত্রালয়কেও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রাগ্রসরের নির্বাহী পরিচালক ফওজিয়া খন্দকার বলেন, পিতৃতন্ত্র অনেক সময় অদৃশ্য কাঠামো হিসেবে কাজ করে, যার ভেতর থেকেই নারীর প্রতি নানা ধরনের নির্যাতন ও বৈষম্য তৈরি করে।
তিনি উল্লেখ করেন, গবেষণা অনুযায়ী প্রায় ৬৮ শতাংশ নারী শারীরিক এবং ৭২ শতাংশ নারী মানসিক (ইমোশনাল) নির্যাতনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তিনি বলেন, এসব সহিংসতা নিয়ে আরও বেশি কথা বলা জরুরি। পরিবর্তনের জন্য শুধু অন্যদের করণীয়ের দিকে তাকিয়ে না থেকে প্রত্যেককে নিজের অবস্থান থেকে প্রশ্ন তোলা, সচেতনতা তৈরি করা এবং প্রতিরোধের উদ্যোগ নেওয়ার মধ্য দিয়েই শুরু করতে হবে।
প্রাগ্রসর মনে করে, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে পিত্রালয়ের ভূমিকাকে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, গবেষণা, নীতিগত উদ্যোগ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা জোরদার করার মাধ্যমে নারীর জন্য আরও নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

অল্প বয়সীদের হাতে স্মার্টফোন মানেই কবর রচনা : সাতক্ষীরার ডিসি
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক (ডিসি) মিজ্ কাউসার আজিজ বলেছেন, ‘আপনারা আপনার অল্প বয়সীবিস্তারিত পড়ুন

দুর্গাপূজায় বাড়লো ছুটি, বাড়লো অনুদানও
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটির সঙ্গে অনুদানের পরিমাণও বাড়িয়েছে সরকার। দুর্গাপূজার জন্যবিস্তারিত পড়ুন

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য
দেশে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে আগামীবিস্তারিত পড়ুন


