এশিয়ার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোর, বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা?


এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন অর্থায়ন, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং আসিয়ান ও প্লাস থ্রি ম্যাক্রোইকোনমিক রিসার্চ অফিসের (এএমআরও) শীর্ষ কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।
এশিয়ার অর্থনীতি নিয়ে নীতিনির্ধারণী আলোচনা বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের মতো বিষয় আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কার্যক্রম ও উন্নয়নশীল সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে সংস্থাটির সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন স্কট মরিস। আঞ্চলিক উন্নয়ন অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংযোগ ও সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগে কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেওয়া তাঁর দায়িত্বের অংশ।
বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের আঞ্চলিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবহন সংযোগ, জলবায়ু সহনশীলতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন। তবে এসব ক্ষেত্রে অর্থায়নের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং ঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ।
ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এলি এম. রেমোলোনা জুনিয়র আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও মুদ্রানীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন অর্থনীতিবিদ। তিনি নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে ১৪ বছর এবং আন্তর্জাতিক নিষ্পত্তি ব্যাংকে ১৯ বছর কাজ করেছেন। ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি আন্তর্জাতিক নিষ্পত্তি ব্যাংকের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন। এ ছাড়া কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি এবং এশিয়া স্কুল অব বিজনেসে শিক্ষকতা করেছেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মুদ্রানীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব বিবেচনায় এ অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতের তারল্য এবং আর্থিক খাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে মুদ্রানীতি কার্যকর করতে ব্যাংক খাতের সুশাসন, ঋণের মান উন্নয়ন এবং আর্থিক তথ্যের স্বচ্ছতাও প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন এ অঞ্চলের ৩৭টি দেশের বিষয়ে সংস্থাটির কার্যক্রম তদারক করেন। ১৯৯৪ সালে আইএমএফে যোগ দেওয়ার পর তিনি সংস্থাটির বিভিন্ন বিভাগে কাজ করেছেন। আন্তর্জাতিক অর্থায়নে তাঁর পিএইচডি ডিগ্রি রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে আইএমএফের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা আনা এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা কমানো বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এসব সংস্কারের সুফল পেতে হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান ও ব্যবসার খরচের ওপর প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।
অন্যদিকে, আসিয়ান ও প্লাস থ্রি ম্যাক্রোইকোনমিক রিসার্চ অফিসের (এএমআরও) পরিচালক ইয়াসুতো ওয়াতানাবের আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, উন্নয়ন অর্থনীতি, আর্থিক নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতায় ৩০ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়ে জ্যেষ্ঠ উপমন্ত্রী পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, এএমআরও এবং আন্তঃআমেরিকান উন্নয়ন ব্যাংকেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন।
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আর্থিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও শিক্ষণীয়। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধি, পণ্যমূল্যের ওঠানামা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তার সময়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা অর্থনৈতিক ঝুঁকি সামলাতে সহায়ক হতে পারে।
আলোচনাটি সঞ্চালনা করবেন নিক্কেই এশিয়ার জ্যেষ্ঠ ফিচার সম্পাদক জন অ্যাগলিয়নবি। তিনি এর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে দুই দশক এবং গার্ডিয়ানের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া প্রতিনিধি হিসেবে আট বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ-
এশিয়ার অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা আনতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতির সমন্বয় প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ও ঋণের মান উন্নয়ন ছাড়া টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করা কঠিন। তৃতীয়ত, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহের সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
এর পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা ও বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
তবে এসব পদক্ষেপের সুফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে না। কার্যকর নীতিমালা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, স্বচ্ছতা এবং ধারাবাহিক সংস্কার বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি।
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

অপারেশন ক্লিন হার্টের মতো অভিযানের পরিকল্পনা নেই : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, অপারেশন ক্লিন হার্টের মতো কোনো অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনাবিস্তারিত পড়ুন

এআই বিপ্লবে পিছিয়ে পড়ছে প্রান্তিক শিশুরা
শিক্ষা ও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই শিক্ষার্থীদেরবিস্তারিত পড়ুন

নিয়ন্ত্রণহীন এলপিজি বাজার, দাম বাড়িয়েও মিলছে না সিলিন্ডার
সরকার নির্ধারিত মূল্যের তোয়াক্কা না করে তীব্র সংকট ও অস্বাভাবিক দামে বিক্রিবিস্তারিত পড়ুন


