পরীক্ষা না দিয়েই মেলে ফল, ফেল করেও এসএসসির রেজাল্ট জিপিএ-৫!


কখনো অকৃতকার্য হয়েও জিপিএ-৫, আবার কখনো পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেই সর্বোচ্চ ফল লাভ—নতুন কোনো ঘটনা নয়। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে প্রতিবছরই এমন চাঞ্চল্যকর ফল জালিয়াতির ঘটনা সামনে আসছে। একই সঙ্গে বোর্ডের ফল প্রস্তুত ও প্রকাশ প্রক্রিয়া, এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন ও গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও জবাবদিহিতার চরম অভাবই বারবার এ ধরনের জালিয়াতি সংঘটিত হওয়ার মূল কারণ। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতার ঘাটতি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতাই প্রকাশ করছে না, বরং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনে বড় ধরনের সংশয় তৈরি করছে।
ধারাবাহিক জালিয়াতির চিত্র
২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা: ফলাফল প্রকাশের পর এক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেলেও পুনঃনিরীক্ষণের সময় দেখা যায় সে ১০টি বিষয়েই অকৃতকার্য হয়েছে। নম্বর জালিয়াতির মাধ্যমে তাকে পাস করানোর অভিযোগে গত ২৯ অক্টোবর বোর্ডের তিন কম্পিউটার অপারেটরসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষা: পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেই জিপিএ-৫ পান ১৭ জন শিক্ষার্থী।
২০২৩ সালের এসএসসি পরীক্ষা: তৎকালীন বোর্ড সচিব নারায়ণচন্দ্র নাথের ছেলের ১১টি বিষয়ে নম্বর জালিয়াতির ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়, যা শেষ পর্যন্ত মামলা পর্যন্ত গড়ায়।
মামলার আসামি ও আইনি পদক্ষেপ
২০২৬ সালের জালিয়াতির ঘটনায় চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় মামলা দায়ের করেন।
আসামিরা হলেন ১. ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী (২৮), স্ক্যানিং অপারেটর, কম্পিউটার সেল। ২. মো. রাশেদুল ইসলাম (৩০), স্ক্যানিং অপারেটর। ৩. নূর হোসেন রায়হান (৩২), কম্পিউটার অপারেটর (সলভার)। ৪. ১৭ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী (সুবিধাভোগী)।
বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন জানান, বুয়েটের বিশেষজ্ঞ এবং অন্য একটি শিক্ষা বোর্ডের সিস্টেম অ্যানালিস্টদের পরামর্শে তারা জালিয়াতির বিষয়টি শনাক্ত করেন। উত্তরপত্র স্ক্যানিংয়ের সময় দুটি মেশিনে ত্রুটির সুযোগ নিয়ে কৌশলে নম্বর পরিবর্তন করা হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞ মত পাওয়া গেছে। বর্তমান মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কম্পিউটার শাখার দুর্বল জনবল ও অব্যবস্থাপনা
বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, মাত্র দুজন প্রোগ্রামার নিয়ে পরিচালিত হতো কম্পিউটার শাখার কার্যক্রম। পরীক্ষার সময় কাজের চাপ সামাল দিতে দৈনিক ভিত্তিতে আরও ৮ থেকে ১০ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হতো, যা ফল প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সিকিউরিটি ঝুঁকি তৈরি করেছিল। পুরো ঘটনাগুলোর পর এখন কম্পিউটার শাখার কার্যক্রম নতুন করে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সাবেক সচিবের বিরুদ্ধেও অভিযোগের ছায়া
তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে বর্তমান সচিব জানান, উত্তরাধিকার সূত্রে এসব ঘটনার দায় এখন বর্তমান প্রশাসনের ওপর এসে পড়েছে। এর আগে তৎকালীন সচিব অধ্যাপক নারায়ণচন্দ্র নাথ নিজের ছেলের ফলাফল পরিবর্তনের ঘটনায় নিজে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে ছিলেন এবং বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আনোয়ারা আলম মনে করেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর উদ্যোগ না নিলে শিক্ষার্থীদের ঘিরে তৈরি হওয়া এ ধরনের নেতিবাচক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কঠিন হবে।
সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন দ্য বলেন, ‘বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে জানা যায়, কম্পিউটারে উত্তরপত্র স্ক্যান করার সময় সমস্যা তৈরি হয়েছে। কম্পিউটারের সফটওয়্যার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এবং বুয়েটের একটি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞ ও অন্য একটি শিক্ষা বোর্ডের সিস্টেম অ্যানালিস্টদের পরামর্শ নিয়ে আমরা বিষয়টি শনাক্ত করি। তাঁরা চিহ্নিত করে দেন, দুটি মেশিনে ১২টি উত্তর স্ক্যান করতে সমস্যা হয়েছিল। সেখানে সমাধানের নামে ফলাফল জালিয়াতি করা হয়েছে বলে মতামত পাওয়া যায়।’
এর ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ওই দুটি মেশিন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের এবং যেসব শিক্ষার্থী এর মাধ্যমে সুবিধাভোগী হয়েছে, তাদের আসামি করা হয়েছে। বিষয়টি এখন তদন্তাধীন। তদন্ত কর্মকর্তারা কাজ করছেন। এ বিষয়ে এর বেশি মন্তব্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। অনেক ধরনের হুমকি উপেক্ষা করে আমি নিজে থানায় গিয়ে দুই দিন বসে থেকে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছি।’
একটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান মন্ত্রী মহোদয় ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা হলো, এ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স।’ পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের সঙ্গে কোনো শিক্ষকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষকের সংশ্লিষ্টতা পাইনি। খাতাগুলো আমাদের কাছে এসেছে। সেগুলো লকারে সংরক্ষিত আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত কর্মকর্তারা যেকোনো সময় চাইলে আমরা সেগুলো তাদের কাছে হস্তান্তর করব। বোর্ডের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হয়তো এসব ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন। তবে তদন্তে প্রকৃত বিষয়টি বেরিয়ে আসুক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার আগে এই পদে দায়িত্ব পালন করা চারজনের একজন এখন কাঠগড়ায়। তার নাম অধ্যাপক নারায়ণচন্দ্র নাথ। তার ছেলের ফলাফল পরিবর্তনের ঘটনায় তিনি নিজেই জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সব বিষয়ে ফলাফল পরিবর্তন করা হয়েছিল। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে, যার দায় এখন আমার ওপরও এসে পড়েছে।’
অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বলেন, ‘তিনি জেলে ছিলেন। যতদূর জানি, এখন জামিনে আছেন। আমার একজন সহকর্মী বিষয়টি জানিয়েছেন। তার সঙ্গে আমার যোগাযোগের কোনো সুযোগ নেই। তবে উত্তরাধিকার সূত্রে এসব ঘটনার দায় এখন আমার ওপর এসে পড়েছে। তীর এখন আমার বুকের দিকে।’
সূত্র: ইত্তেফাক
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

প্রথম ধাপে ১ হাজার ৫০ ইউনিয়ন পরিষদে ভোট: ইসি সচিব
সারাদেশে প্রথম ধাপে ১ হাজার ৫০টি ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবেবিস্তারিত পড়ুন

সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির পঞ্চম বৈঠকে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদবিস্তারিত পড়ুন

শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ইমোশন নয়, আইনের পথেই এগোবে সরকার: আইনমন্ত্রী
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কোনো আবেগ বাবিস্তারিত পড়ুন


