এগ্রোইকোলজি’কে নীতিতে অন্তর্ভুক্তির দাবি
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে জলবায়ু-সহনশীল খাদ্যব্যবস্থা শীর্ষক সংলাপ


বাংলাদেশে জলবায়ু-সহনশীল খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে এগ্রোইকোলজি চর্চা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষক হিসেবে নারীর স্বীকৃতি, নারী শ্রমিকের মজুরি বৈষম্য দূরীকরণ এবং জাতীয় নীতিতে এগ্রোইকোলজিকে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বেলা ২টায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের ল্যাবে ‘বাংলাদেশে জলবায়ু-সহনশীল খাদ্যব্যবস্থা: এগ্রোইকোলজিই পথ দেখায়’ শীর্ষক আঞ্চলিক সংলাপে এসব কথা উঠে আসে। সংলাপে সভাপতিত্ব করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ খান। বারসিকের উপকূলীয় আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শাহীন ইসলাম মূল উপস্থাপনা করেন। তাঁর উপস্থাপনার পর শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অংশগ্রহণকারীরা উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন।
আলোচনায় সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক তানভীর হোসাইন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানের পাশাপাশি তাঁরা বিভিন্ন গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাঁর পিএইচডি গবেষণার ৮৬ পৃষ্ঠার মধ্যে ছয় পৃষ্ঠা বারসিকের শ্যামনগর কর্মএলাকার সুন্দরবননির্ভর মানুষের জীবন ও বাস্তবতা নিয়ে। তিনি আরও বলেন, বছরের প্রায় পাঁচ মাস সুন্দরবন বন্ধ থাকায় বনজীবীদের জীবিকায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। এ সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে যে সীমিত সহায়তা দেওয়া হয়, তা বনজীবীদের প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। কমিউনিটি পর্যায় থেকে উঠে আসা দাবি ও সুপারিশগুলো গবেষণায় তুলে ধরা হলেও সেগুলো সরকারি নীতিনির্ধারণে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে।
সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী নওশিন নোয়ার প্রমি বলেন, নারীরা পরিবারে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ কাজ করলেও এসব কাজের জন্য কোনো শ্রমমজুরি পান না। এগ্রোইকোলজি চর্চা সম্প্রসারিত হলে পানি সংগ্রহ, কৃষিকাজ, বীজ সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর কাজের চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই নারীর কাজের ক্ষেত্রকে আরও নমনীয় ও সহায়ক করার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে।
অধ্যাপক ড. মোসাম্মত রওশন আরা বলেন, দেশে এখনো নারী শ্রমিকের মজুরি বৈষম্য রয়েছে। কৃষক বলতেই সাধারণ মানুষের চিন্তায় পুরুষের নাম আসে, অথচ কৃষির সূচনালগ্ন থেকেই নারীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। নারীর হাত ধরেই কৃষির পাশাপাশি বীজ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনারও বিকাশ ঘটেছে।
তিনি বলেন, মানুষের খাদ্য এমন হওয়া উচিত, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা গুরুত্বপূর্ণ পথ দেখাতে পারে। তাই সরকারের বিদ্যমান নীতিমালায় কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যাকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সবাইকে সম্মিলিতভাবে সোচ্চার হতে হবে।
আলোচনার এক পর্যায়ে অধ্যাপক ড. তুহিন রায় বলেন, বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে প্রযুক্তির ব্যাপক প্রয়োগের ফলে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় নানা ধরনের সংকট তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে রাসায়নিক কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার সেই ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। এর ফলে আমাদের খাদ্যব্যবস্থা দিন দিন অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য এগ্রোইকোলজি র বিকল্প নেই। এর মাধ্যমে টেকসই কৃষি, নিরাপদ খাদ্য এবং খাদ্য সার্বভৌমত্ব অর্জনের পথ তৈরি হতে পারে।
সংলাপে সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. সেলিনা আহমেদ, অধ্যাপক মোসাম্মত রওশন আরা, অধ্যাপক তানভীর হোসাইন, ড. তুহিন রায়সহ অন্যান্য শিক্ষক, পিএইচডি গবেষক, মাস্টার্স ও বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং বিভাগের কর্মকর্তারা অংশ নেন। আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, খাদ্যব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা, কৃষকের স্বীকৃতি, নারী শ্রমের মূল্যায়ন, নারী শ্রমিকের মজুরি বৈষম্য দূরীকরণ, নিরাপদ খাদ্য এবং জাতীয় কৃষিনীতি ও পরিকল্পনায় কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যার অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মতবিনিময় হয়।
সমাপনী বক্তব্যে সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ খান বারসিকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “এত চমৎকার ও সময়োপযোগী একটি বিষয় নিয়ে সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের সঙ্গে কাজ করার উদ্যোগ নেওয়ায় বারসিককে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আজকের সংলাপ থেকে উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন সংকট ও বাস্তবতা চিহ্নিত করে সেকেন্ডারি স্টেকহোল্ডারদের মাধ্যমে তা নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে কৃষি, পরিবেশ, নারী ও কৃষকের অধিকারকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে এগ্রোইকোলজি র চর্চা ও নীতিগত স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জ্ঞান বিনিময়, লোকায়ত জ্ঞানের প্রসার এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে নিরাপদ ও জৈব খাদ্য উৎপাদনের যে পথ (এখানে পথ বলতে এগ্রোইকোলজি) বারসিক আমাদের সামনে উন্মোচন করছে, সেটিকে আরও এগিয়ে নিতে হবে। আজ রবিবার থেকে বারসিক ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যে পথচলা শুরু হলো, তা অত্যন্ত শুভ ও ফলপ্রসূ হোক- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে ড্রোনের মাধ্যমে মাদক ঢুকছে বাংলাদেশে: আইনমন্ত্রী
পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে ড্রোনের মাধ্যমে মাদক ঢুকছে বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচারবিস্তারিত পড়ুন

বিপুল অস্ত্র-গোলাবারুদসহ সুন্দরবনের নানা ভাই বাহিনীর ১২ ডাকাতের আত্মসমর্পণ
সুন্দরবনের কুখ্যাত নানা ভাই বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর মোড়ল ওরফে রহমতসহ ১২ সক্রিয়বিস্তারিত পড়ুন

পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী
জ্বালানি সংকট মোকাবেলা ও বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে সরকার আগামী পাঁচ বছরে ১০বিস্তারিত পড়ুন


