থাইল্যান্ডে বিদেশি ব্যবসার প্রসার, বাংলাদেশের সম্ভাবনায় বাধা কেন?


দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র থাইল্যান্ড। দেশটির বাজারে চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, তাইওয়ান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি করছে। কেউ ইলেকট্রনিকস ও যন্ত্রপাতি, কেউ গাড়ি ও শিল্পের যন্ত্রাংশ, আবার কেউ জ্বালানি, রাসায়নিক ও কৃষিপণ্য সরবরাহ করে বাজার বিস্তৃত করছে।
বিপরীতে, বড় অভ্যন্তরীণ বাজার, তরুণ শ্রমশক্তি ও রপ্তানিমুখী শিল্প থাকা সত্ত্বেও থাইল্যান্ডের বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে।
থাইল্যান্ডের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটির মোট আমদানি ছিল প্রায় ৩০১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে চীন থেকে এসেছে প্রায় ৮০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা মোট আমদানির ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ। জাপান থেকে এসেছে ২৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, তাইওয়ান থেকে ২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে যথাক্রমে ১৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। তথ্যটি দেখায়, থাইল্যান্ডের বাজারে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের বড় উপস্থিতি রয়েছে।
কোন দেশ কী পণ্য রপ্তানি করে
চীন থাইল্যান্ডে টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক পণ্য, যন্ত্রপাতি ও ভোগ্যপণ্যের বড় সরবরাহকারী। জাপান গাড়ি, গাড়ির যন্ত্রাংশ এবং শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতিতে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তাইওয়ান সরবরাহ করে সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক চিপ ও কম্পিউটার-সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে শিল্পপ্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহের ক্ষেত্র জ্বালানি ও খনিজ তেল।
থাইল্যান্ডের নিজস্ব উৎপাদন ও রপ্তানিশিল্পও বিস্তৃত। দেশটি কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিকস, গাড়ি ও যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, রাবারজাত পণ্য, চাল এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি করে। ফলে বিদেশি সরবরাহকারীদের জন্য শুধু ভোক্তাবাজার নয়, দেশটির শিল্পকারখানার সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ারও সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা কোথায়?
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, সিরামিক, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত মাছ এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য থাইল্যান্ডের বাজারে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হতে পারে। তবে এসব পণ্যের বাস্তব চাহিদা, আমদানি শুল্ক, স্থানীয় প্রতিযোগিতা, পণ্যের মান ও বাজারে প্রবেশের শর্ত যাচাই করে রপ্তানি কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
থাইল্যান্ডে বাজার সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের স্থানীয় আমদানিকারক ও পরিবেশকদের সঙ্গে অংশীদারত্ব, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় অংশগ্রহণ এবং ই-কমার্সভিত্তিক বিপণনে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে মানসম্মত পোশাক, পরিবেশবান্ধব পাটপণ্য, প্রতিযোগিতামূলক দামের সিরামিক এবং নির্ধারিত মান পূরণকারী ওষুধের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে।
তবে সোমবার (১২ অক্টোবর) থাই চেম্বারে সাথে বৈঠক শেষে রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, থাইল্যান্ডের সঙ্গে কৃষি ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের আলোচনা: থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়েও ইতিবাচক অগ্রগতির কথা জানান রাশেদ আল তিতুমীর। তিনি বলেন, থাই চেম্বারের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য কয়েকটি সম্ভাবনাময় খাত তুলে ধরা হয়েছে। এসব খাতে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে কৃষিজাত পণ্য, ফল, দুগ্ধজাত পণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে থাই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা গেছে বলে জানান তিনি। বাংলাদেশে মৌসুমে আম, কাঁঠাল ও লিচুর মতো ফলের সরবরাহ বেশি থাকলেও পর্যাপ্ত হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে অনেক পণ্য নষ্ট হয়। কৃষকেরাও অনেক সময় ন্যায্য দাম পান না। এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে হালাল বাজারসহ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোই সরকারের লক্ষ্য নয়; বরং উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সংযোগ গড়ে তুলে সামগ্রিক বাণিজ্য বাড়াতে চায় বাংলাদেশ।
এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে এমন উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে কোনো পণ্যের প্রাথমিক উপকরণ বাংলাদেশে উৎপাদিত হবে, মধ্যবর্তী পণ্য থাইল্যান্ডে তৈরি হবে এবং পরে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করা হবে। আবার কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে এর বিপরীত ব্যবস্থাও গড়ে উঠতে পারে।
বিনিয়োগে পিছিয়ে থাকার কারণ-
বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ গুরুত্বপূর্ণ বাধা। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনেও দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ ও বিদেশি বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, থাইল্যান্ডের প্রতিষ্ঠিত উৎপাদনশিল্প, আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থা ও বিনিয়োগ সহায়তা বিদেশি ব্যবসার জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করেছে। ফলে বাংলাদেশকে শুধু করছাড় বা প্রণোদনা দিয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করলে হবে না; ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশের সামনে তাই দুটি লক্ষ্য—থাইল্যান্ডের বাজারে রপ্তানি বাড়ানো এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নিজেকে প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরা। এর জন্য প্রয়োজন পণ্যভিত্তিক বাজার গবেষণা, মান নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা।
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

শ্রমবাজারে নতুন দিগন্ত, ৮ মাসে বিদেশে গেছেন প্রায় সাড়ে চার লাখ কর্মী
যুদ্ধের কালো মেঘ আর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মেঘ কাটিয়েও বিদেশের শ্রমবাজারে নিজেদেরবিস্তারিত পড়ুন

নোবেলজয়ী ইউনূসকে হেনস্তা, সরকারের তীব্র নিন্দা
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারেরবিস্তারিত পড়ুন

এসএসসিতে ফেল করলে ১৫ দিনের মধ্যে ফের পরীক্ষা : শিক্ষামন্ত্রী
মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদেরবিস্তারিত পড়ুন


