মাঠের ফসল ঘরেই হবে খাঁটি সস-আচার: ভরা মৌসুমে লোকসান ঠেকিয়ে কৃষকের পকেট ভরার সহজ উপায়


ভরা মৌসুমে ফসলের বাম্পার ফলন দেখে কৃষকের চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক উঠলেও, সেই আনন্দ খুব বেশি সময় স্থায়ী হয় না। পণ্য হাটে তোলার পরপরই পচনশীল কাঁচামালের বাজার দর হু হু করে নামতে শুরু করে। একদিকে কোল্ড স্টোরেজের অভাব, অন্যদিকে দ্রুত পচে যাওয়ার ভয়—এই দুই সংকটে পড়ে কৃষক তার ঘাম ঝরানো ফসল পানির দামে ফড়িয়া বা পাইকারদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন। টমেটো, আম, কাঁচামরিচ কিংবা কুলের মতো পচনশীল ফসলে লোকসানের এই নির্মম ছবি আমাদের দেশের কৃষিতে নতুন কিছু নয়। তবে এই চিরচেনা চিত্রটি সহজেই বদলে দেওয়া সম্ভব, যদি কাঁচা ফসল সরাসরি বিক্রি না করে সঠিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ বা ‘মূল্য সংযোজন’ করা যায়।
মৌসুমের উদ্বৃত্ত ফসল থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সস, জ্যাম, জেলি, স্কোয়াশ বা আচার তৈরি করলে তা কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। কাঁচা অবস্থায় যে পণ্যের বাজারমূল্য নামমাত্র, প্রক্রিয়াজাত হওয়ার পর তার মূল্য বেড়ে দাঁড়ায় কয়েক গুণ। যেমন—ভরা মৌসুমে প্রতি কেজি টমেটোর বাজারদর যখন ১০ থেকে ১৫ টাকায় নেমে আসে, তখন কাঁচা টমেটো বিক্রি করে উৎপাদন খরচই ওঠে না। অথচ সেই একই এক কেজি টমেটো থেকে তৈরি টমেটো সস বা ক্যাচাপ বাজারে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব। একইভাবে, মৌসুমের অতিরিক্ত কাঁচা ও পাকা আম বাজারে নামমাত্র দামে না ছেড়ে তা দিয়ে সুস্বাদু আচার, আমসত্ত্ব বা জ্যাম বানিয়ে রাখলে অফ-সিজনে তা কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করা যায়।
কৃষি পণ্যে মূল্য সংযোজনের মূল ভিত্তি হলো সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ প্রযুক্তি। আধুনিক সংরক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে পণ্যের পচনশীলতা রোধ করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, টমেটো সেদ্ধ করে মণ্ড তৈরি করে তাতে ভিনেগার ও নির্দিষ্ট মাত্রার নিরাপদ প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করে কাঁচের এয়ারটাইট বয়ামে রাখলে তা ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত অনায়াসে ভালো থাকে। কাঁচা ও পাকা আম রোদে শুকিয়ে আমসত্ত্ব বা সরিষার তেল ও মসলা দিয়ে আচার বানিয়ে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়। পেয়ারার ভেতরের প্রাকৃতিক উপাদান ‘পেকটিন’ ব্যবহার করে তৈরি করা যায় উন্নত মানের জেলি। অন্যদিকে, কাঁচামরিচ ও রসুনের ব্লেন্ড করা পেস্ট অথবা হট সস তৈরি করে রেখে দিলে অফ-সিজনে যখন এসবের দাম আকাশচুম্বী হয়, তখন বড় ধরনের মুনাফা অর্জন করা যায়।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ে প্রক্রিয়াজাতকরণের উদ্যোগ সফল করতে হলে কয়েকটি মৌলিক বিষয় সতর্কতার সঙ্গে মেনে চলা জরুরি। প্রথমত, খাদ্যপণ্যের গুণগত মান ও শতভাগ স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখা আবশ্যক। প্যাক করার ক্ষেত্রে উন্নত মানের কাঁচের বয়াম বা ফুড-গ্রেড প্লাস্টিক বোতল ব্যবহার করতে হবে, যেন ভেতরে বাতাস প্রবেশ করতে না পারে। দ্বিতীয়ত, ভিনেগার, সাইট্রিক এসিড কিংবা সোডিয়াম বেনজোয়েটের মতো অনুমোদিত উপাদান সঠিক পরিমাণে ব্যবহারের নিয়ম জানতে হবে। তৃতীয়ত, বাণিজ্যিকভাবে পণ্য বিক্রির জন্য আকর্ষণীয় নাম, লোগো, উৎপাদনের ও মেয়াদের তারিখ সম্বলিত লেবেল যুক্ত করা প্রয়োজন। পরবর্তীতে বিএসটিআই (BSTI) অনুমোদন ও ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে স্থানীয় সুপারশপ, মুদি দোকান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে সরাসরি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এই পণ্য বাজারজাত করা সম্ভব।
এই প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা কেবল কৃষকের লোকসানই ঠেকায় না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের প্রসেসিং বা প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর প্র্যাকটিক্যাল প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে ক্ষুদ্র ঋণের সুযোগ জোরদার করে, তবে পচনশীল কৃষি পণ্যের অপচয় শূন্যে নেমে আসবে। মৌসুমে ফসল নষ্ট না করে তা প্রক্রিয়াজাত করে বাজারে তোলাই হতে পারে আমাদের দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও কৃষকের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।
ফিচারটি লিখেছেনঃ কৃষিবিদ মিঠুন সরকার, (বিএসসি এজি)
ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সরকার এগ্রো সীড, যশোর
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনায় দ্বিগুণ হতে পারে দেশের নারিকেল উৎপাদন
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামীণ বসতবাড়ির আঙিনায় কিংবা বাণিজ্যিক বাগানে নারিকেল গাছ দেখাবিস্তারিত পড়ুন

কলারোয়ায় বার্ষিক পুষ্টি কর্মপরিকল্পনা বিষয়ে সেমিনার
কলারোয়ায় বার্ষিক পুষ্টি কর্মপরিকল্পনা বিষয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। ICT কোচিং সেন্টার মঙ্গলবারবিস্তারিত পড়ুন

দেশে পর্যাপ্ত সার আছে, দুষ্টু লোকেরা মজুত করায় সংকট: কৃষিমন্ত্রী
দেশে পর্যাপ্ত সার থাকলেও কিছু লোকের মজুতের কারণে কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছেবিস্তারিত পড়ুন


