সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনায় দ্বিগুণ হতে পারে দেশের নারিকেল উৎপাদন


বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামীণ বসতবাড়ির আঙিনায় কিংবা বাণিজ্যিক বাগানে নারিকেল গাছ দেখা গেলেও সঠিক পুষ্টির অভাবে বহু গাছই কাক্সিক্ষত ফলন দিচ্ছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কৃষকরা মনে করেন, নারিকেল গাছ নিজ থেকেই বেড়ে ওঠে এবং এর অতিরিক্ত পরিচর্যার প্রয়োজন নেই। তবে কৃষিবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত ও মানসম্মত ফলন পেতে হলে গাছকে সঠিক বয়সে পরিমিত ও সুষম পুষ্টি উপাদান জোগানো অত্যন্ত জরুরি। কোনো অনুমাননির্ভর সার ব্যবহার না করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সুষম সার প্রয়োগই নারিকেল চাষে সাফল্য আনার একমাত্র চাবিকাঠি।
পুষ্টি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব ও গাছের বয়সানুযায়ী বৈচিত্র্য
একটি ফলন্ত নারিকেল গাছ প্রতি বছর মাটি থেকে বিপুল পরিমাণ পুষ্টি উপাদান শোষণ করে। যদি সেই পুষ্টি নিয়মিত মাটিতে ফেরত না দেওয়া হয়, তবে গাছের পাতা হলুদ হয়ে যায়, ফুল ঝরে পড়ে এবং ডাবের আকার ছোট হয়ে আসে। চারা রোপণের পর থেকে পূর্ণবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত গাছের পুষ্টির চাহিদা ভিন্ন হয়। প্রাথমিক বয়সে (১-৪ বছর) গাছের শিকড় ও পাতার কাঠামোগত বৃদ্ধির জন্য কম পরিমাণে কিন্তু নিয়মিত সার প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে, ফলনশীল গাছে ফল গঠন ও নতুন কাঁদি বের হওয়ার উপযোগী করে সারের মাত্রা বাড়াতে হয়।
প্রধান ও গৌণ পুষ্টি উপাদানের বৈজ্ঞানিক ভূমিকা
নারিকেল গাছের প্রধান খাদ্য হলো নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম। পটাশিয়াম (এমওপি) নারিকেলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ফলের শাঁস গঠনে সাহায্য করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ফল ঝরা রোধ করে। নাইট্রোজেন (ইউরিয়া) পাতার সতেজতা ও শারীরিক বৃদ্ধিতে এবং ফসফরাস (টিএসপি/ডিএপি) শক্তিশালী শিকড় গঠনে সহায়তা করে। এছাড়া, জিংক ও বোরন সারের ভূমিকা অপরিসীম। বোরনের অভাবে ফল বিকৃত হয় বা জাঁতা ধরে ছোট হয়ে যায়।
জৈব পদার্থের অপরিহার্যতা ও সারের বৈজ্ঞানিক যুক্তি
রাসায়নিক সার গাছের তাৎক্ষণিক খাদ্যের জোগান দিলেও মাটির স্বাস্থ্য ঠিক রাখে জৈব সার, যেমন-
পচা গোবর বা ভার্মিকম্পোস্ট। জৈব সার মাটির পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং উপকারী অণুজীবের
ক্রিয়াকলাপ বজায় রাখে। ইউরিয়া দ্রুত উদ্ভিদে গ্রহণযোগ্য নাইট্রোজেন সরবরাহ করে;
টিএসপি ধীরে ধীরে কাণ্ড ও শিকড় মজবুত করে এবং এমওপি পটাশিয়ামের ঘাটতি মেটায়।
রাসায়নিক ও জৈব সারের যৌথ সমন্বয়ই সুষম সার ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি।
সার প্রয়োগের সঠিক সময় ও কিস্তি
বছরে অন্তত দুই কিস্তিতে সার প্রয়োগ করা সবচেয়ে কার্যকর। প্রথম কিস্তি বর্ষার শুরুতে (বৈশাখ-
জ্যৈষ্ঠ) এবং দ্বিতীয় কিস্তি বর্ষার শেষে (আশি^ন-কার্তিক) প্রয়োগ করা উচিত। সেচসুবিধা
থাকলে ৩-৪ কিস্তিতে ভাগ করে দিলে অপচয় কম হয়। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত বা চরম খরার সময় সার দেওয়া
ঠিক নয়।
প্রয়োগ পদ্ধতি ও রিং তৈরি
গাছের কাণ্ডের একদম গোড়ায় সার দেওয়া বড় ভুল। নারিকেল গাছের খাদ্য গ্রহণকারী কচি শিকড় কাণ্ড
থেকে ১ মিটারের পর বিস্তার লাভ করে। তাই কাণ্ড থেকে অন্তত ১ মিটার বাদ দিয়ে চতুর্দিকে ১.০ থেকে
২.৫ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত একটি চক্রাকার নালা বা রিং তৈরি করতে হবে। মাটিতে ২০-৩০ সেমি
গভীরতায় সার ছড়িয়ে দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে।
আর্দ্রতার গুরুত্ব ও অতিরিক্ত সারের ঝুঁকি
সার প্রয়োগের পর মাটিতে পর্যাপ্ত রস থাকা বা হালকা সেচ দেওয়া আবশ্যক; অন্যথায় সার শিকড়কে
পুড়িয়ে ফেলতে পারে। একতরফা কেবল ইউরিয়া সার প্রয়োগ করলে গাছ দ্রুত লম্বালম্বি বাড়লেও শাখা ও
কাণ্ড দুর্বল হয়, রোগবালাইয়ের আক্রমণ বাড়ে এবং ফল ধারণক্ষমতা কমে যায়।
মাটির ধরন, পিএইচ ও পুষ্টি ঘাটতির লক্ষণ
বেলে মাটিতে পুষ্টি দ্রুত ধুয়ে যায় বলে সেখানে জৈব সারের পরিমাণ বাড়িয়ে কয়েক কিস্তিতে
রাসায়নিক সার দিতে হয়। আঠালো বা ভারী মাটিতে নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। মাটির
পিএইচ ৫.৫-এর নিচে হলে চুন/ডলোমাইট এবং ৮.০-এর বেশি হলে জিপসাম ব্যবহার করা আবশ্যক।
গাছে পাতার রঙ ফেকাশে হওয়া, কচি পাতা কোঁকড়ানো বা ডাব পচে ঝরে পড়া পুষ্টি ও
মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতির স্পষ্ট লক্ষণ।
বিশেষজ্ঞ মত
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বারি) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সার সুপারিশ
নির্দেশিকা অনুসারে, সার প্রয়োগের মাত্রা কখনো অনুমাননির্ভর হওয়া উচিত নয়। মাটি পরীক্ষা
করে সারের পরিমাণ নির্ধারণ করাই সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও বিজ্ঞানসম্মত। একটি পূর্ণবয়স্ক (১১-১৫
বছর) নারিকেল গাছে সাধারণ সুপারিশ হিসেবে বছরে প্রায় ২৫ কেজি গোবর, ১ কেজি ইউরিয়া,
৫০০ গ্রাম টিএসপি, ২ কেজি এমওপি, ৩৫০ গ্রাম জিপসাম, ১০০ গ্রাম জিংক সালফেট এবং ৩০
গ্রাম বোরিক এসিড দুই কিস্তিতে সঠিক রিং পদ্ধতিতে প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে আঞ্চলিক
মাটির গুণাগুণ ও গাছের স্বাস্থ্যের ওপর ভিত্তি করে এটি কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।
কৃষকের জন্য করণীয়
১. প্রতি বছর বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ও আশি^ন মাসে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে দুই কিস্তিতে সার প্রয়োগ
করুন।
২. গাছের মূল কাণ্ড থেকে অন্তত ১ মিটার দূরত্ব রেখে বৃত্তাকারে নালা কেটে সার মিশিয়ে দিন।
৩. রাসায়নিক সারের পাশাপাশি অবশ্যই পর্যাপ্ত পচা গোবর বা কমপোস্ট ব্যবহার করুন।
৪. সার দেওয়ার পর মাটিতে রসে ঘাটতি থাকলে হালকা সেচের ব্যবস্থা করুন।
৫. একতরফা ইউরিয়া সার ব্যবহার বন্ধ করে পটাশ ও বোরন সারের ব্যবহারে গুরুত্ব দিন।
৬. হলুদ বা সবুজ রঙের সুস্থ পাতা কখনোই কেটে ফেলবেন না, শুকিয়ে গেলে তা সংগ্রহ করুন।
৭. যেকোনো সমস্যায় স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা কৃষি অফিসে পরামর্শ নিন।
নারিকেল একটি বহুবর্ষজীবী অর্থকরী ফসল, যা যুগের পর যুগ ফলন দিয়ে থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে
সঠিক যত্ন ও নিয়মিত সুষম খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করলে এ গাছ বছরের পর বছর পরিবার ও বাগানের
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ধরে রাখতে পারে। নির্বিচারে রাসায়নিক সার না ঢেলে মাটির স্বাস্থ্যরক্ষা ও
সুষম সার প্রয়োগের মানসিকতা গড়ে তোলাই হতে পারে টেকসই কৃষি উন্নয়নের মূল ভিত্তি।
ফিচারটি লিখেছেনঃ
কৃষিবিদ মিঠুন সরকার, (বিএসসি ইন এগ্রিকালচার)
কলারোয়া নিউজে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (Unauthorized use of news, image, information, etc published by kalaroa News is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.)
একই রকম সংবাদ সমূহ

কলারোয়ায় বার্ষিক পুষ্টি কর্মপরিকল্পনা বিষয়ে সেমিনার
কলারোয়ায় বার্ষিক পুষ্টি কর্মপরিকল্পনা বিষয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। ICT কোচিং সেন্টার মঙ্গলবারবিস্তারিত পড়ুন

দেশে পর্যাপ্ত সার আছে, দুষ্টু লোকেরা মজুত করায় সংকট: কৃষিমন্ত্রী
দেশে পর্যাপ্ত সার থাকলেও কিছু লোকের মজুতের কারণে কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছেবিস্তারিত পড়ুন

কলারোয়ায় নিরাপদ মৎস্য চাষ প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত
সাতক্ষীরার কলারোয়ায় নিরাপদ ও আধুনিক পদ্ধতিতে মৎস্য চাষ বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিতবিস্তারিত পড়ুন


